জাতীয় ফিচার শীর্ষ দুই

প্রথাগত শিক্ষার বাইরে নতুন ভাবনা: ‘সন্তানকে ফার্মের মুরগির মতো বড় করতে চাইনি’ বললেন অপ্রতিমের মা

নিহত স্কুলছাত্র অপ্রতিমের ছবি এবং গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্যরত অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম।
বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের চেয়ে আজকাল জিপিএ বা ভালো ফলের পেছনে অন্ধের মতো ছোটার এক সর্বনাশা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তীব্র প্রতিযোগিতার এই যুগে অধিকাংশ অভিভাবকই যখন সন্তানকে শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় বন্দি রাখছেন, তখন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন অপ্রতিমের মা। প্রথাগত মুখস্থবিদ্যা আর চার দেয়ালের বন্দিদশা থেকে বের করে তিনি নিজের সন্তানকে বড় করেছেন এক উন্মুক্ত ও স্বাধীন পরিবেশে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে অপ্রতিমের এক বিশেষ কৃতিত্বের পর তার মায়ের এই সাহসী মন্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সচেতন অভিভাবকদের মাঝে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মূল হাইলাইটস
  • প্রথাগত জিপিএ বা মুখস্থবিদ্যার ওপর জোর না দিয়ে সন্তানের স্বাধীন চিন্তার বিকাশকে প্রাধান্য দিয়েছেন অপ্রতিমের মা।
  • পরীক্ষানির্ভর সমাজব্যবস্থায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী যখন মানসিক চাপে পিষ্ট, তখন প্রথা ভেঙে সন্তানকে মুক্তভাবে বড় করার কথা বলেন তিনি।
  • বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল পুথিগত বিদ্যা নয়, বরং বাস্তব জ্ঞান ও জীবনমুখী দক্ষতাই যে মূল চালিকাশক্তি, তা আজ প্রমাণিত।
  • সমসাময়িক অভিভাবকদের জন্য অপ্রতিমের মায়ের এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি বড় শিক্ষণীয় বার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
প্রথা ভাঙা এক সাহসী অভিভাবকত্ব
আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় সন্তানদের শৈশব থেকেই এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে নামিয়ে দেওয়া হয়। ভালো স্কুল, জিপিএ ফাইভ আর নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির তীব্র চাপে পিষ্ট হতে হতে হারিয়ে যায় একটা শিশুর স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ। ঠিক এই জায়গাটাতেই একদম ভিন্নভাবে ভেবেছিলেন অপ্রতিমের মা। তিনি তার সন্তানকে কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার যন্ত্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাননি। তার লক্ষ্য ছিল এমন এক মুক্ত চিন্তার মানুষ তৈরি করা, যে যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পথ চলতে পারবে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার জন্য একজন শিক্ষার্থীকে যে ধরনের মানসিক প্রস্তুতি নিতে হয়, অপ্রতিম তা পেয়েছে নিজের ঘর থেকেই। প্রথাগত গণ্ডির বাইরে গিয়ে খেলাধুলা, সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তার চিন্তার জগৎ প্রসারিত হয়েছে। অপ্রতিমের মা বিশ্বাস করেন, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া পড়াশোনা সাময়িক সাফল্য দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা মানুষের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে না। সে কারণেই তিনি প্রথাগত নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে সন্তানকে নিজের মতো করে ডানা মেলার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মুক্ত চিন্তার প্রভাব
আজকের দিনে অনেক শিক্ষার্থীই উচ্চশিক্ষার আঙিনায় এসে খেই হারিয়ে ফেলে। এর মূল কারণ হলো, তারা ছোটবেলা থেকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে শেখেনি। কিন্তু অপ্রতিমের ক্ষেত্রে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার মায়ের দেওয়া সেই স্বাধীনতার শিক্ষা আজ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। জটিল কোনো সমস্যার সমাধান কিংবা নতুন কোনো গবেষণার কাজ—সবখানেই অপ্রতিম নিজের সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রাখছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন স্বাধীনচেতা শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম। অধিকাংশ পরিবারেই সন্তানদের ওপর নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা একমুখী চিন্তায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই সংকটের দিনে অপ্রতিমের মা আমাদের দেখিয়েছেন কীভাবে সন্তানের মনের ওপর বাড়তি চাপ না দিয়েও তাকে একজন সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। তার এই উদ্যোগ তরুণ সমাজকে নতুন করে ভাবতে শেখাবে।
অভিভাবকদের জন্য এক নতুন বার্তা
বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় যেখানে প্রতিটি মা-বাবাই সন্তানের ক্যারিয়ার নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে থাকেন, সেখানে অপ্রতিমের মা এক নতুন আশার আলো। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সন্তানের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা মানে তাকে সব সময় চোখে চোখে রাখা বা শুধু পড়ার টেবিলে বসিয়ে রাখা নয়। বরং আসল ভালোবাসা হলো তাকে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করার মতো যোগ্য করে গড়ে তোলা।
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখন বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে অভিজ্ঞতা ও জীবনমুখী শিক্ষার ওপর। এই সময়ে এসে অপ্রতিমের মায়ের এই যুগান্তকারী বক্তব্যটি দেশের লাখো অভিভাবককে তাদের সন্তানদের লালন-পালনের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে। সন্তানকে খাঁচায় বন্দি না রেখে যদি খোলা আকাশে উড়তে দেওয়া হয়, তবেই সে নিজের সর্বোচ্চ সম্ভাবনাকে ছুঁতে পারবে।
নিহত স্কুলছাত্র অপ্রতিমের ছবি এবং গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্যরত অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম।
ণমাধ্যমের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত অপ্রতিমের মা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগম; ডানে অপ্রতিমের ফাইল ছবি।

মাসুম

About Author

I am a sarvent of Allah. I follow mohammad (sm) only. "La ilaha Illallahu Muhammadur rasulullah"

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র