সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৫ হাজারের বেশি
দেশের সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। গত সাড়ে ছয় বছরে ১৬ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ হাজার ৭১২ জন। একই সময়ে আহত হয়েছেন আরও ১৪ হাজার ১৪৩ জন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। শনিবার (৮ আগস্ট) গণমাধ্যমে সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান প্রতিবেদনটি পাঠান। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশের মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে মোট ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা হয়েছে ভারী যানবাহনের ধাক্কায়। এ ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা ৬ হাজার ৩১৪টি, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।
মোটরসাইকেল চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে ঘটেছে ৫ হাজার ৪৯৭টি দুর্ঘটনা। মোট দুর্ঘটনার হিসাবে এর হার ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ। এছাড়া মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ হাজার ৫৪৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার ২২ দশমিক ০৮ শতাংশ। অন্যান্য কারণে ঘটেছে আরও ৭০৬টি দুর্ঘটনা।
### বছর যত গড়িয়েছে, বেড়েছে দুর্ঘটনা
বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ সালে ১ হাজার ৩৮১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৪৬৩ জন নিহত হন।
পরের বছর দুর্ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ২০২১ সালে ২ হাজার ৭৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২ হাজার ২১৪ জন। ২০২২ সালে ২ হাজার ৯৭৩টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৩ হাজার ৯১ জন।
২০২৩ সালে দুর্ঘটনা কিছুটা কমে ২ হাজার ৫৩২টিতে দাঁড়ালেও মৃত্যু হয় ২ হাজার ৪৮৭ জনের। ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৬১টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬০৯ জন এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জন নিহত হন।
চলতি ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৩১১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ১৭৭ জন।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ভারী ও পণ্যবাহী যানবাহনের সংশ্লিষ্টতা সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
সংগঠনটির হিসাবে, মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশের জন্য দায়ী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর, ট্রলি ও লরি। এ ধরনের যানবাহনের কারণে ঘটেছে ৬ হাজার ৪৮১টি দুর্ঘটনা।
অন্যদিকে মোটরসাইকেল চালকের একক দায় রয়েছে ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে। বাসের কারণে ঘটেছে ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ দুর্ঘটনা। থ্রি-হুইলারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ দুর্ঘটনায়।
এ ছাড়া প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের কারণে ঘটেছে ২ দশমিক ৭২ শতাংশ দুর্ঘটনা।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। প্রতিবেদন বলছে, দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, এই বয়সী চালকদের একটি অংশ অতিরিক্ত গতিতে ও বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
সংগঠনটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ট্রাফিক আইন অমান্য করা, চালকদের বেপরোয়া আচরণ, আইনের দুর্বল প্রয়োগ, সড়কের ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামো এবং যানবাহন চলাচলে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব।
এ ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের সংকট এবং দীর্ঘস্থায়ী যানজটকেও দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে সংগঠনটি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে শুধু চালকদের সচেতন করাই যথেষ্ট নয়। সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন, ট্রাফিক আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ, যানবাহন নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।





