৩৬ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড মাইলফলকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবশেষে একটি বড় স্বস্তির খবর এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের গ্রস বা মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ এখন ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্মানজনক মাইলফলক অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ২৫ জুন পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী দেশের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৮২ দশমিক ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিলিয়নের হিসাবে প্রায় ৩৬ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলার। দীর্ঘ ৪৩ মাস পর দেশের রিজার্ভের খাতায় এমন বড় অঙ্কের দেখা মেলায় সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক মহলে ইতিবাচক হাওয়া বইছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত কয়েক মাস ধরেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ঠিক আগের দিনগুলোতেও গ্রস রিজার্ভ এবং বিপিএম-৬ পদ্ধতির রিজার্ভের গ্রাফ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। অর্থনীতির এই ধারাবাহিক উন্নতি দেশের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতাকে বড় ধরনের সুরক্ষা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত একটি দেশের ৩ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ থাকাকে নিরাপদ ধরা হয়, তবে বর্তমান সঞ্চয় দিয়ে অনায়াসেই ৫ মাসেরও বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
চলতি বছরের শুরুর দিকে রিজার্ভের ওপর যে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছিল, তা কাটাতে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে বিলাসবহুল পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি এবং হুন্ডি প্রতিরোধে কঠোর নজরদারির সুফল এখন হাতেনাতে মিলছে। একই সাথে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দর বাজারভিত্তিক বা ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে কিছুটা সমন্বয় করায় বৈধ পথে প্রবাসী আয় আসার গতি বহুলাংশে বেড়েছে।
সাধারণ পাঠক বা সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব এবং আইএমএফের হিসাবের মধ্যে এই বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান কেন হয়। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক যখন গ্রস রিজার্ভের হিসাব করে, তখন বিভিন্ন তহবিলে বিনিয়োগ করা অর্থসহ সব ধরনের বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল’ বা বিপিএম-৬ পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, রিজার্ভের মোট হিসাব থেকে সমস্ত স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক দায় এবং অবিক্রয়যোগ্য বা আটকে থাকা তহবিল বাদ দেওয়া হয়। যার ফলে বিপিএম-৬ অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য নিট রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ হাজার ৫৩২ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে, যা অত্যন্ত শক্তিশালী একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি নির্দেশ করে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং বিশ্বব্যাংক থেকে প্রাপ্ত বড় অঙ্কের বাজেট সহায়তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এর এই নতুন রেকর্ড গড়তে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে এডিবি থেকে প্রাপ্ত ১০০ কোটি ডলার সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে যুক্ত হয়। এর পাশাপাশি জুনের প্রথম তিন সপ্তাহেই প্রবাসীরা প্রায় সোয়া ২০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন।
সরকারের কার্যকর আর্থিক কৌশল এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানামুখী সংস্কারমূলক উদ্যোগের কারণেই ডলারের বাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কেটে যাচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ, রিজার্ভের এই সুসময় ধরে রাখতে হলে রপ্তানি আয়ের বহুমুখীকরণ এবং অর্থপাচার রোধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বজায় রাখতে হবে।





