যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হচ্ছেন?
যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে তীব্র ঝড় তুলে অবশেষে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে এক আবেগঘন বক্তৃতায় তিনি নিজের দায়িত্ব ছাড়ার কথা জানানোর পরপরই যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নাম প্রবলভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে। দলীয় এমপিদের নজিরবিহীন চাপ এবং সাম্প্রতিক উপ-নির্বাচনে লেবার পার্টির ভরাডুবির পর স্টারমার এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। তার এই আকস্মিক প্রস্থান ব্রিটেনের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে এবং ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেতরে এখন পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
স্যার কিয়ের স্টারমার মাত্র দুই বছর আগে ২০২৪ সালে লেবার পার্টিকে এক ঐতিহাসিক ও বিশাল জয় এনে দিয়েছিলেন। তবে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দেশের অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি নীতি এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে দলের ভেতরেই তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। বিশেষ করে সম্প্রতি মেকারফিল্ডের বিশেষ উপ-নির্বাচনে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের বিশাল জয় এবং লেবার পার্টির মূল ধারার ভোট কমার পর স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে চূড়ান্ত বিদ্রোহ দেখা দেয়। নিজের দলের আইনপ্রণেতাদের অনাস্থা টের পেয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়ানোর পথ বেছে নেন।
স্টারমার জানিয়েছেন যে, সেপ্টেম্বর মাসে পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই লেবার পার্টির নতুন প্রধান এবং যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বেছে নেওয়ার কাজ সম্পন্ন হবে। তবে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের পক্ষে যেভাবে একের পর এক হেভিওয়েট নেতা সমর্থন প্রকাশ করছেন, তাতে নির্বাচন প্রক্রিয়া খুব বেশি দীর্ঘায়িত নাও হতে পারে। স্টারমার নিজে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দায়িত্ব পালন করবেন যাতে ক্ষমতার হস্তান্তর অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়।
গ্রেইটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ব্রিটেনের সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এক মুখ। সম্প্রতি উপ-নির্বাচনে জিতে পার্লামেন্টে ফিরে আসার পর থেকেই তাকে স্টারমারের বিকল্প ভাবা হচ্ছিল। লেবার পার্টির একটি বড় অংশ মনে করছে, বর্তমানের এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে বার্নহ্যামই পারেন দলকে পুনরায় সচল করতে।
সবচেয়ে বড় চমক তৈরি হয়েছে যখন স্টারমারের মন্ত্রিসভার অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য এবং সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়েস স্ট্রিটিং নিজে এই লড়াই থেকে সরে দাঁড়িয়ে বার্নহ্যামকে সমর্থন দিয়েছেন। স্ট্রিটিং সাফ জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে নিজেদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুড়ি না করে দলের ঐক্য বজায় রাখাই প্রধান লক্ষ্য। এই নাটকীয় সমর্থনের ফলে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার পথ অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে গেছে। যদি অন্য কোনো প্রার্থী শেষ পর্যন্ত দাঁড়াতে না পারেন, তবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়েই তিনি ব্রিটেনের শাসনভার গ্রহণ করতে পারেন।
যুক্তরাজ্যের নতুন নেতা হিসেবে যিনিই দায়িত্ব নিন না কেন, তার সামনে চ্যালেঞ্জের পাহাড় অপেক্ষা করছে। কনজারভেটিভ পার্টির পতনের পর লেবার পার্টি যেভাবে দেশবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিল, স্টারমার প্রশাসন তা পুরোপুরি ধরে রাখতে পারেনি। উল্টো নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন ‘রিফর্ম ইউকে’ এবং গ্রিন পার্টির মতো দলগুলো হু হু করে সাধারণ মানুষের সমর্থন পকেটে পুরছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে নতুন ডাউনিং স্ট্রিট প্রধানের প্রধান পরীক্ষা।
বার্নহ্যামের অনুসারীরা দাবি করছেন, তিনি তৃণমূল থেকে উঠে আসা নেতা এবং শ্রমিক শ্রেণির মানুষের ভাষা বোঝেন। তবে লন্ডনের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু জনপ্যপ্রিয়তা দিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে না। কিয়ের স্টারমারের বিদায়কে অনেক বিশ্লেষক ব্রিটিশ রাজনীতির অস্থিরতার আরেক অধ্যায় হিসেবে দেখছেন, যেখানে গত ১০ বছরে দেশবাসী ৭ জন প্রধানমন্ত্রীকে ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করতে দেখল।





