অর্থ-বাণিজ্য ফিচার

রিজার্ভে স্বস্তি: ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল গ্রস, আইএমএফের হিসাবেও বড় লাফ

রিজার্ভে স্বস্তি: ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল গ্রস, আইএমএফের হিসাবেও বড় লাফ

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিয়ে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট বা গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তথা বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুসারেও নিট রিজার্ভ ৩০ বিলিয়নের মনস্তাত্ত্বিক ঘর অতিক্রম করেছে।

এক সপ্তাহের ব্যবধানে বড় লাফ

আজ সোমবার (১ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের এই হালনাগাদ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডলার সংকটে ভুগতে থাকা দেশের মুদ্রা বাজারের জন্য এই পরিসংখ্যানকে বেশ ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর আগে গত ২৩ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব পদ্ধতিতে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৪ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, মাত্র ৯ দিনের ব্যবধানে গ্রস রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ২০ কোটি বা শূন্য দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, একই সময়ে আইএমএফের বেঁধে দেওয়া ‘বিপিএম-৬’ (BPM6) হিসাব পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে।

আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) চাঙ্গা ভাব এবং রফতানি আয়ের ইতিবাচক ধারার কারণেই মূলত মে মাসের শেষ সপ্তাহে এসে রিজার্ভের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাধারণত জুন ক্লোজিং বা অর্থবছর শেষের এই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের বিভিন্ন ঋণ ও অনুদানের অর্থ ছাড় হওয়ার কারণেও রিজার্ভে বড় ধরনের যোগান তৈরি হয়।

রিজার্ভের ব্যবচ্ছেদ: দুই পদ্ধতির পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রিজার্ভের বর্তমান চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

  • গ্রস বা মোট রিজার্ভ (বাংলাদেশ ব্যাংক পদ্ধতি): ১ জুন পর্যন্ত এই হিসাব অনুযায়ী মজুত ৩৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা ২৩ মে ছিল ৩৪ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার।

  • নিট বা প্রকৃত রিজার্ভ (বিপিএম-৬ পদ্ধতি): আইএমএফের এই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বর্তমান রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার, যা পূর্ববর্তী সপ্তাহে ছিল ২৯ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার।

  • বৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি: উভয় পদ্ধতিতেই এক সপ্তাহের ব্যবধানে রিজার্ভের সূচক ইতিবাচক দিকে ধাবিত হয়েছে, যা আমদানির দায় মেটানোর সক্ষমতা বাড়াবে।

অর্থনীতিতে এর তাৎপর্য ও চ্যালেঞ্জ

একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো সমপরিমাণ ডলার মজুত থাকতে হয়। বর্তমানের ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি নিট রিজার্ভ দিয়ে বাংলাদেশ অনায়াসে ৪ থেকে ৫ মাসের আমদানি দায় মেটাতে পারবে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারী ও দাতা সংস্থাগুলোর কাছে দেশের ঋণমান (Credit Rating) ধরে রাখতে সাহায্য করবে।

তবে এই স্বস্তি যেন ক্ষণস্থায়ী না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, সামনেই এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মে-জুন মেয়াদের আমদানি বিল পরিশোধের বড় চাপ আসবে। তখন রিজার্ভ থেকে এক ধাক্কায় বিশাল অঙ্কের ডলার কেটে নেওয়া হবে। তাই এখন থেকেই হুন্ডি প্রতিরোধ ও বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনার ধারা আরও জোরদার করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, রিজার্ভের এই ঘুরে দাঁড়ানো দেশের ডলার বাজারকে কিছুটা শান্ত করবে এবং টাকার অবমূল্যায়ন রোধে ভূমিকা রাখবে। তবে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামার ওপর গভীর নজর রাখা জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংক যদি রেমিট্যান্সের এই সুবাতাস ধরে রাখতে পারে এবং অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল পণ্য আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে, তবে আগামী দিনগুলোতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার