ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি: ট্রাম্পের নতুন শর্তে মধ্যপ্রাচ্যে চরম নাটকীয়তা
ইরান সংকট নিরসনে প্রস্তাবিত খসড়া শান্তি চুক্তিতে শেষ মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বড় ধরনের শর্ত পরিবর্তনের উদ্যোগে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার পর তৈরি করা চুক্তির বেশ কয়েকটি ধারা আরও কঠোর করার ট্রাম্পের এই আকস্মিক চেষ্টা দুই দেশের মধ্যকার সমঝোতা প্রক্রিয়াকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। শনিবার মার্কিন গণমাধ্যমগুলো এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গতকাল শনিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর এক এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যে খসড়া রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছেন। বিশেষ করে তেহরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক কর্মসূচির লাগাম টেনে ধরার বিষয়গুলোতে মার্কিন প্রশাসন আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
আলোচনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সংশোধিত এই নতুন খসড়া বা ‘কঠোর কাঠামোটি’ চূড়ান্ত বিবেচনার জন্য ইতিমধ্যেই তেহরানের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তনকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যেখানে সব পক্ষ একটি চূড়ান্ত চুক্তির দিকে এগোচ্ছিল, সেখানে ট্রাম্পের এই ‘চাপ প্রয়োগের নীতি’ পুরো প্রক্রিয়াটিকে আবার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারে। তেহরান এই নতুন শর্তগুলো কতটা মেনে নেবে, তা নিয়ে খোদ মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেই সন্দেহ রয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে এই চুক্তিটি ছিল এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক উদ্যোগ। কিন্তু মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে পর্দার আড়ালে আলোচনা চললেও এখনো চূড়ান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা বা চুক্তি সই হয়নি। ট্রাম্পের এই নতুন চালের পর পক্ষগুলোর মধ্যকার দূরত্ব আরও বেড়েছে।
মনে করা হচ্ছে, ট্রাম্প ঘরোয়া রাজনীতিতে নিজের ‘শক্তিশালী নেতা’র ভাবমূর্তি ধরে রাখতে এবং মিত্রদেশ ইসরায়েলের চাপ সামলাতেই শেষ মুহূর্তে শর্ত কঠিন করার পথ বেছে নিয়েছেন। তবে এই অনমনীয় অবস্থান ইরানকে চুক্তির টেবিল থেকে সরিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রধান বিবেচ্য বিষয়সমূহ
-
শর্তের কড়াকড়ি: পূর্বনির্ধারিত খসড়া চুক্তি থেকে সরে এসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতার ওপর আরও সুদূরপ্রসারী ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি তুলেছেন।
-
নতুন রূপরেখা প্রেরণ: ওয়াশিংটনের সংশোধিত প্রস্তাবটি ইতিমধ্যেই তেহরানের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী মহলে পাঠানো হয়েছে, যা এখন পর্যালোচনার অধীন।
-
চূড়ান্ত সমঝোতার অভাব: মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ব্যাপক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে মূল বিষয়গুলো নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত ঐক্যমত্য হয়নি।
-
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি: এই সমঝোতা ভেস্তে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
কোন পথে মধ্যপ্রাচ্য?
ট্রাম্পের এই আকস্মিক শর্ত পরিবর্তনকে অনেকে এক ধরনের ‘পলিটিক্যাল গ্যাম্বলিং’ বা রাজনৈতিক জুয়া হিসেবে দেখছেন। ওয়াশিংটন যদি মনে করে থাকে যে অতিরিক্ত চাপ দিয়ে তারা তেহরানকে নতি স্বীকার করাবে, তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। ইরান অতীতেও মার্কিন একতরফা চাপের মুখে আপস না করার নীতি দেখিয়েছে।
এখন সবার নজর তেহরানের প্রতিক্রিয়ার দিকে। ইরান যদি এই নতুন প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার এই ঐতিহাসিক সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে যাবে। ফলে সামনের দিনগুলোতে বিশ্ববাজার, তেলের রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক নতুন ও জটিল সমীকরণের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।





