শুভেন্দু অধিকারীর তিন দশকের রাজনৈতিক মহাকাব্য
তিন দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই, চড়াই-উতরাই আর অদম্য জেদ—সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বসছেন পূর্ব মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র শুভেন্দু অধিকারী। নব্বইয়ের দশকে জাতীয় কংগ্রেসের হাত ধরে শুরু হওয়া সেই সাধারণ যুবকের যাত্রা আজ এক ঐতিহাসিক মাইলফলকে পৌঁছাল। অজয় মুখোপাধ্যায়ের দীর্ঘ কয়েক দশক পর ফের কলকাতার বাইরের কোনো নেতা রাজ্যের শাসনভার নিচ্ছেন।
কংগ্রেস থেকে শুরু, উত্তরণ কাঁথির মাটি থেকে
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনীতিতে হাতেখড়ি গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ শুভেন্দু বেছে নিয়েছিলেন ভারতের জাতীয় কংগ্রেসকে। নব্বইয়ের পুরো সময়টাই তিনি কংগ্রেসের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। তবে তাঁর প্রথম বড় রাজনৈতিক সাফল্যের স্বাদ আসে ১৯৯৫ সালে। নিজের ঘরের মাঠ কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পুরপ্রধান হিসেবে তাঁর দক্ষ প্রশাসন মেদিনীপুরের রাজনীতিতে অধিকারী পরিবারের প্রভাব আরও সুসংহত করে।
বিধানসভার পথ ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে
২০০৬ সাল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ছিল পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী সময়। সেই বছরই কাঁথি দক্ষিণ আসন থেকে জয়লাভ করে প্রথমবার বিধানসভায় পা রাখেন শুভেন্দু। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দু অধিকারী কেবল একজন জননেতা নন, বরং একজন দক্ষ সংগঠক। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সাথে তাঁর সরাসরি সংযোগ তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। তিন দশকের নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টার পর আজ তিনি যখন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন, তখন সেটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত জয় নয়, বরং জেলা স্তরের রাজনীতির এক বিরাট জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: অজয় মুখোপাধ্যায়ের উত্তরসূরি
শুভেন্দুর এই উত্থান পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ১৯৬৭ সালে পূর্ব মেদিনীপুরের সন্তান অজয় মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। দীর্ঘ ৫৭ বছর পর আবারও সেই মেদিনীপুর থেকেই কেউ বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, অজয় মুখোপাধ্যায়ের পর থেকে এ পর্যন্ত যারা মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছেন, তাদের কারোরই শেকড় কলকাতার বাইরে বা এই রাজ্যের ভেতরে এত গভীরে ছিল না। বাংলার আগের তিন দিকপাল মুখ্যমন্ত্রী—বিধানচন্দ্র রায়, প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ এবং প্রফুল্লচন্দ্র সেন—সবারই আদি নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশে। এমনকি বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম বিহারে হলেও তাঁর পিতৃপুরুষ ছিলেন সাতক্ষীরার সন্তান। সেই অর্থে শুভেন্দু অধিকারী কলকাতার বাইরের অঞ্চল থেকে উঠে আসা দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়লেন।
এক নজরে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক যাত্রা:
সূচনা: নব্বইয়ের দশকের শুরুতে জাতীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ।
প্রথম জয়: ১৯৯৫ সালে কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া।
প্রশাসনিক দক্ষতা: পরবর্তীকালে কাঁথি পুরসভার পুরপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন।
সংসদীয় রাজনীতি: ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো বিধায়ক নির্বাচিত হওয়া।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: অজয় মুখোপাধ্যায়ের (১৯৬৭) পর দ্বিতীয় মেদিনীপুরী মুখ্যমন্ত্রী।
কলকাতার রাজপথের বাইরের কোনো জেলা থেকে আসা নেতার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া রাজ্যের প্রশাসনিক ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এতদিন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যে ‘কলকাতা-কেন্দ্রিক’ আধিপত্য ছিল, শুভেন্দুর আগমনে তা কিছুটা হলেও মফস্বল বা জেলা স্তরের মানুষের কাছে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বার্তা দিচ্ছে।
শুভেন্দু অধিকারীর এই যাত্রাপথ মসৃণ ছিল না। ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছাতে তাঁকে যেমন প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে, তেমনি নিজের দলেও বারবার অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে। অজয় মুখোপাধ্যায়ের উত্তরসূরি হিসেবে মেদিনীপুরের এই সন্তান বাংলার সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা কতটুকু পূরণ করতে পারেন, এখন সেটিই দেখার বিষয়।





