অন্যান্য ফিচার বিশ্ব সংযোগ

মধ্যপ্রাচ্যে কী তবে শুরু হচ্ছে নতুন কোনো ‘স্থল যুদ্ধ’?

মধ্যপ্রাচ্যে কি তবে শুরু হচ্ছে নতুন কোনো ‘স্থল যুদ্ধ’?

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখন খাদের কিনারায়। দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ যখন ঘোর অনিশ্চয়তায়, ঠিক তখনই হোয়াইট হাউসের অন্দরে গুঞ্জন উঠছে ইরানে সরাসরি ‘স্থল যুদ্ধ’ বা ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ পাঠানোর।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুরনো ‘যুদ্ধবিরোধী’ অবস্থান ছাপিয়ে এখন যুদ্ধের দামামা আরও জোরালো হচ্ছে।


রণক্ষেত্রে ট্রাম্প: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

নির্বাচনী প্রচার থেকে শুরু করে ওভাল অফিসে আসীন হওয়া পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার একটি বিষয়েই জোর দিয়েছেন—মধ্যপ্রাচ্যের ‘অন্তহীন ও চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ (Endless War) থেকে মার্কিন সেনাদের ফিরিয়ে আনা। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বলছে ভিন্ন কথা। গত ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি শেষ হতে চললেও, তেহরানের সাথে আলোচনার টেবিলে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং এই বিরতির আড়ালে পেন্টাগন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের সামরিক শক্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে তুলেছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এখন এক অদ্ভুত দ্বিমুখী অবস্থানে। একদিকে তারা আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে ইরানের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম সৈন্য সমাবেশ ঘটাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প কি তার নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি নিজেই ভাঙতে চলেছেন?

‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ এবং ১০ হাজার সেনার আগমন

পেন্টাগনের সাম্প্রতিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, চলতি এপ্রিল মাসের শেষ নাগাদ এই অঞ্চলে অতিরিক্ত ১০ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন সম্পন্ন হবে। রণতরী, আকাশপথের পর এবার স্থলবাহিনী পাঠানোর এই প্রস্তুতি সরাসরি সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জনসমক্ষে কী বলছেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি বাস্তবে কী করছেন। যখন কোনো রাষ্ট্রনায়ক একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ সামরিক সম্পদ ও জনবল স্তূপ করেন, তখন তার ব্যবহার করার প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যায়।” ভায়েজের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ স্থল আক্রমণ এখন আর কেবল অনুমান নয়, বরং বেশ বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা।


বর্তমান পরিস্থিতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক:

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় মুহূর্তের মূল চালিকাশক্তিগুলো হলো:

  • যুদ্ধবিরতির সমাপ্তি: গত ৮ এপ্রিল শুরু হওয়া ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ফুরিয়ে আসায় দুই দেশের সামরিক বাহিনী এখন ‘হাই অ্যালার্টে’ রয়েছে।

  • সৈন্য সংখ্যা: বর্তমান সমাবেশের ফলে এই অঞ্চলে মার্কিন সেনার মোট সংখ্যা বিগত কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।

  • কূটনৈতিক অচলাবস্থা: দ্বিতীয় দফার আলোচনার বিষয়ে তেহরানের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া না আসায় ওয়াশিংটন সামরিক চাপকেই প্রধান অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে।

  • ট্রাম্পের রণকৌশল: ট্রাম্প সাধারণত কঠোর সামরিক চাপের (Maximum Pressure) মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে চান, তবে এবারের সৈন্য সমাবেশ সেটিকে ছাড়িয়ে সরাসরি যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে।


সংঘাতের আশঙ্কায় বিশ্ব ও আঞ্চলিক রাজনীতি

ইরানে যদি শেষ পর্যন্ত মার্কিন স্থলবাহিনী প্রবেশ করে, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং সারা বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা তৈরি করবে। তেহরান ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো আঘাত এলে তারা চুপ করে থাকবে না। অন্যদিকে, মার্কিন কংগ্রেসের ভেতরও এই সম্ভাব্য স্থল অভিযান নিয়ে বিভক্তি বাড়ছে। ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকরা একে ‘জাতীয় স্বার্থে কঠোর পদক্ষেপ’ বললেও, সমালোচকদের মতে এটি হবে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় ভুল।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার