রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপির ইশতেহার, দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী নয়
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ক্ষমতায় গেলে এক ব্যক্তির টানা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকা, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃজন এবং সংসদের উচ্চকক্ষ প্রবর্তনের মতো যুগান্তকারী সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক জমকালো অনুষ্ঠানে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার সময় এসব তথ্য জানানো হয়।
ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রশাসনিক সংস্কার
বিএনপির এবারের ইশতেহারে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা। দলটি ঘোষণা করেছে, এখন থেকে একজন ব্যক্তি দুই মেয়াদের অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। ক্ষমতার একক কেন্দ্রীভবন ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় ‘উপ-রাষ্ট্রপতি’ পদ পুনরায় ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
সংসদীয় ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে বিএনপি ‘দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট’ আইনসভার প্রস্তাব করেছে। বর্তমানে দেশে কেবল একটি কক্ষ (জাতীয় সংসদ) থাকলেও, নতুন পরিকল্পনায় একটি ‘উচ্চকক্ষ’ গঠন করা হবে। এই উচ্চকক্ষে দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করা হবে যাতে আইন প্রণয়নে গুণগত মান নিশ্চিত হয়।
সংসদীয় গণতন্ত্রে নতুন মাত্রা
গণতন্ত্রের সুফল সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে বিএনপি সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলের ভূমিকাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চায়। ইশতেহারে বলা হয়েছে, সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিরোধী দল থেকে ‘ডেপুটি স্পিকার’ নির্বাচন করা হবে। এটি দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক নতুন রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সূচনা করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে দলটির পরিকল্পনা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষে ২০ শতাংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হবে। এছাড়া বর্তমান সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার পক্ষেও অবস্থান জানিয়েছে দলটি।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধান হাইলাইটস:
-
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ: কোনো ব্যক্তি টানা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
-
উপ-রাষ্ট্রপতি পদ: প্রশাসনিক কাঠামোয় ভারসাম্য আনতে উপ-রাষ্ট্রপতির পদ সৃজন।
-
উচ্চকক্ষ প্রবর্তন: আইনসভায় অভিজ্ঞ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠন।
-
বিরোধী দলের অংশগ্রহণ: বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের বিধান।
-
নারী নেতৃত্ব: উচ্চকক্ষে ২০ শতাংশ নারী নিশ্চিতকরণ এবং সংরক্ষিত নারী আসন ১০০-তে উন্নীত করা।
-
সংবিধান সংস্কার: ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকারের স্বাধীনতা প্রদান।
বিশ্লেষণ ও আগামীর রাজনীতি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই ইশতেহার মূলত দলটির পূর্বঘোষিত ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচির একটি নির্বাচনী প্রতিফলন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দেওয়া এবং বিরোধী দলকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের চিরাচরিত ‘বিজয়ী সব পায়’ (Winner takes all) সংস্কৃতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই বিশাল প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়নে সংবিধানের ব্যাপক রদবদল প্রয়োজন হবে, যা নির্ভর করছে আগামী নির্বাচনে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের ওপর।
বিএনপির এই ‘ভিশনারি’ ইশতেহার ভোটারদের মাঝে কতটা সাড়া জাগায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই ইশতেহারকে ‘জনগণের ক্ষমতায়নের সনদ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে জয়লাভ করলে এই সংস্কারগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে দেশবাসী।





