বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি অর্থনীতিতে উন্নতি: বিশ্বব্যাংক
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’ (জানুয়ারি ২০২৬) প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উন্নতি দেখা গেছে। আগামী দুই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পূর্বাভাস সংশোধন করে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (চলতি FY26) জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৬ শতাংশে উন্নীত হবে, যা পূর্বের অক্টোবর পূর্বাভাসের (৪.৮%) চেয়ে সামান্য কম। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে (FY27) এটি আরও বেড়ে ৬.১ শতাংশে পৌঁছাবে, যা জুনের পূর্বাভাসের চেয়ে ০.৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
এই ঊর্ধ্বমুখী সংশোধনের পেছনে রয়েছে মূল্যস্ফীতির চাপ কমার ফলে ব্যক্তিগত ভোগ বৃদ্ধি, শক্তিশালী শিল্প কার্যক্রম ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সাধারণ নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা হ্রাস পাবে এবং নতুন সরকারের মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের ফলে শিল্প সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হবে। এসব কারণে সরকারি ব্যয় ও বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধিও পূর্বাভাসের চেয়ে দ্রুততর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, চলমান বাণিজ্য উত্তেজনা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখাচ্ছে। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে কমে ২.৬ শতাংশে নামবে এবং ২০২৭ সালে সামান্য বেড়ে ২.৭ শতাংশে পৌঁছাবে। এই পূর্বাভাস জুনের তুলনায় কিছুটা উন্নত, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি বড় অর্থনীতির ভালো পারফরম্যান্সের কারণে। তবে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে ২০২০-এর দশকটি ১৯৬০-এর দশকের পর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির দিক থেকে সবচেয়ে দুর্বল দশক হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে নীতিগত পরিবর্তনের আগে বাণিজ্যে অগ্রিম তৎপরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে দ্রুত সমন্বয়ের ফলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু এসব সাময়িক প্রণোদনা ২০২৬ সালে কমে যাবে, কারণ বাণিজ্য গতি শ্লথ হবে এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হবে। তবে বৈশ্বিক আর্থিক অবস্থার শিথিলতা এবং কয়েকটি বড় অর্থনীতিতে রাজস্ব সম্প্রসারণ এই মন্দা কিছুটা সামাল দিতে সহায়তা করবে। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে কমে ২.৬ শতাংশে নামবে, যার পেছনে শ্রমবাজারের শীতলতা এবং জ্বালানির দাম কমার ভূমিকা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্ডারমিত গিল বলেন, “প্রতিটি বছর পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি সৃষ্টিতে কম সক্ষম হলেও নীতিগত অনিশ্চয়তার প্রতি যেন আরও স্থিতিস্থাপক হয়ে উঠছে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, ধীরগতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি ঋণের রেকর্ড উচ্চমাত্রা যুক্ত হলে তা সরকারি অর্থব্যবস্থা ও ঋণবাজারে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রাজস্ব চাপ বাড়ছে, যেখানে সরকারি ঋণ গত অর্ধশতকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ এম আয়হান কোসে বলেন, “উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে সরকারি ঋণ গত অর্ধশতকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোয় রাজস্ব বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার এখন জরুরি অগ্রাধিকার।” তিনি বলেন, সঠিকভাবে নকশা করা রাজস্ব বিধি ঋণ স্থিতিশীল করতে ও নীতিগত সুরক্ষা পুনর্গঠনে সহায়তা করতে পারে, তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবায়ন এবং টেকসই রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ওপর।
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির এই পূর্বাভাস অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, যেমন জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে FY26-এ ৪.৬% এবং FY27-এ ৫.৪% প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। এটি দেশের অর্থনীতিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সংস্কারের ওপর নির্ভরশীলতা তুলে ধরে, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে ত্বরান্বিত করতে পারে।





