৪০ দিনের ধ্বংসযজ্ঞে লন্ডভন্ড ইরান: ১৮ লাখ কোটি টাকার ক্ষতি
টানা ৪০ দিনের প্রলয়ংকরী যুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ইরানের অর্থনীতি ও অবকাঠামো। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘জেরুজালেম পোস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই স্বল্পকালীন যুদ্ধে ইরানের আনুমানিক ১৪৫ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকার সমপরিমাণ।
স্তব্ধ ইরান: ধুলোয় মিশেছে কয়েক দশকের উন্নয়ন
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার পর গত ৪০ দিনের সরাসরি সংঘাত ইরানের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে বলে দাবি করছেন সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। আকাশপথে চালানো নিখুঁত ও বিধ্বংসী হামলায় ইরানের প্রধান শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের তেহরান, ইসফাহান ও বন্দর আব্বাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর শিল্প অবকাঠামো এখন মৃতপ্রায়। শত শত কারখানা ধ্বংস হওয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এর ফলে কয়েক দশকের মধ্যে দেশটিতে বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অবকাঠামো ও জনজীবনে চরম বিপর্যয়
কেবল সামরিক স্থাপনা নয়, যুদ্ধের আঁচ লেগেছে সাধারণ মানুষের মৌলিক সেবা খাতেও। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশটির প্রধান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানোয় ইরানের অর্ধেকেরও বেশি এলাকা এখন অন্ধকারে ডুবে আছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় শিল্পকারখানার পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে জরুরি চিকিৎসাসেবাও।
যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা বলতে গিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েক ডজন ব্রিজ বা সেতু এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো এখন ব্যবহারের অনুপযোগী। এর ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বহির্বিশ্বের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিমানবন্দরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান ও মূল প্রভাব
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ও স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে যুদ্ধের যে আর্থিক খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে, তা এক কথায় আঁতকে ওঠার মতো:
-
মোট আর্থিক ক্ষতি: প্রায় ১৪০ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকা)।
-
ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনা: বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেল শোধনাগার, প্রধান বিমানবন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সেতু।
-
বেকারত্ব: শিল্প কারখানা ধ্বংস হওয়ায় কয়েক লাখ শ্রমিক ও পেশাজীবী নতুন করে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
-
অর্থনৈতিক মন্দা: জিডিপি প্রবৃদ্ধি তলানিতে ঠেকেছে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি: পুনরুদ্ধার কি সম্ভব?
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিমাণ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ইরানের অন্তত দুই থেকে তিন দশক সময় লাগতে পারে। বিশেষ করে দেশটির ওপর দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় বিদেশি বিনিয়োগ বা যন্ত্রাংশ আমদানি করে অবকাঠামো মেরামত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। অনেক বিশেষজ্ঞ এই যুদ্ধকে ‘ইরানের অর্থনীতির হার্ট অ্যাটাক’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
জেরুজালেম পোস্টের এই প্রতিবেদন নিয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো বড় প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও, স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র হাহাকার ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে। বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যাওয়ায় সাধারণ ইরানিদের জীবন এখন ওষ্ঠাগত।





