মধ্যপ্রাচ্যের ১৪ দেশে ছড়িয়ে পড়ল ভয়াবহ যুদ্ধ, নিহত ২৫০০ ছাড়াল
ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি গুঁড়িয়ে দিতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান এখন এক প্রলয়ংকরী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১৪টি দেশ এই সংঘাতের আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২,৫৩০ জন।
নিয়ন্ত্রণের বাইরে রণক্ষেত্র: কেন এই সংঘাত?
গত ফেব্রুয়ারির শেষলগ্নে যখন ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ‘অপারেশনাল কোলাবরেশন’ হিসেবে ইরানের স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোতে হামলা শুরু করে, তখন উদ্দেশ্য ছিল তেহরানের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দেওয়া। কিন্তু পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হিসাব ওলটপালট করে দিয়ে ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা একযোগে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে যা ছিল সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ অভিযান, তা মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ ধারণ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের যে চাপা উত্তেজনা ছিল, তা এই অভিযানের মাধ্যমে বিস্ফোরিত হয়েছে। লেবানন থেকে ইয়েমেন, সিরিয়া থেকে ইরাক—শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি পক্ষই এখন রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ। গত কয়েক দশকের মধ্যে এই অঞ্চল এমন ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়নি, যেখানে সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে সংঘাত ১৪টি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে।
মানবিক বিপর্যয় ও আল-জাজিরার পরিসংখ্যান
যুদ্ধের লেলিহান শিখা কেবল সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং লোকালয়গুলোতেও আঘাত হানছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক করুণ চিত্র। নিহত ২,৫৩০ জনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাধারণ নাগরিক রয়েছেন, যারা দুই পক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলার শিকার হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি, ব্যাহত হচ্ছে জরুরি চিকিৎসাসেবা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধের এই বিস্তার কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক নয়, বরং এটি একটি মানবিক ট্র্যাজেডি। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে ড্রোন হামলার ব্যবহার বেসামরিক প্রাণহানি বাড়িয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যাত্রীবাহী বিমানের বদলে যুদ্ধবিমান আর ব্যালিস্টিক মিসাইলের দখলে।
যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি ও মূল তথ্যসমূহ:
-
সূচনা: ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬; যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের মাধ্যমে।
-
বিস্তৃতি: মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশ বর্তমানে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুদ্ধের শিকার।
-
প্রাণহানি: অন্তত ২,৫৩০ জন (সূত্র: আল-জাজিরা)।
-
মূল লক্ষ্য: ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা।
-
অর্থনৈতিক প্রভাব: বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা এবং রেড সি রুটে পণ্য পরিবহন প্রায় বন্ধ।
ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা ও স্থবির কূটনীতি
একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘ ১৫ বছরের অভিজ্ঞতায় এমন দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংঘাত বিরল। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে জাতিসংঘ বা বড় কোনো শক্তির মধ্যস্থতায় আলোচনার পথ খোলা থাকে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, কূটনীতি এখন লাইফ সাপোর্টে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের অবস্থানে অনড়, অন্যদিকে ইরান ‘সর্বাত্মক প্রতিরোধ’-এর ঘোষণা দিয়ে প্রক্সি গ্রুপগুলোকে সক্রিয় করে তুলেছে। এই ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ বা শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়ার ফলে জর্ডান, সৌদি আরব এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোও এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো যদি এখনই কার্যকর কোনো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব টেবিলে না আনতে পারে, তবে এই সংঘাত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নেওয়াও অসম্ভব কিছু নয়। লোহিত সাগর থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালী পর্যন্ত জলপথগুলো এখন রণক্ষেত্র, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে এক বড় ধরণের ধস নামাতে পারে।





