মধ্যপ্রাচ্যে রক্তক্ষয়ী ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ ১০০ দিনে
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিমান হামলার মধ্য দিয়ে যে সংঘাতের সূচনা হয়েছিল, আজ রোববার সেই ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ ১০০ দিনে পদার্পণ করল। অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এই সামরিক অভিযান শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মার্কিন প্রশাসন যুদ্ধ শুরু করলেও, তা এখন এক দীর্ঘমেয়াদি ও রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে ব্যাক-চ্যানেলে যুদ্ধবিরতি নিয়ে জটিল আলোচনা চলছে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে রকেট, ড্রোন এবং বিমান হামলা পুরোপুরি থামেনি। সামরিক এই দীর্ঘসূত্রতা মার্কিন জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে, যার ফলে এটি এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক দেওয়াল ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
এক নজরে মূল তথ্য
-
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলার পর আজ যুদ্ধের ১০০ দিন পূর্ণ হলো।
-
যুদ্ধবিরতির কূটনৈতিক চেষ্টা চললেও পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
-
মার্কিন নাগরিকদের বড় অংশই এই দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের ঘোর বিরোধী।
-
সামনেই মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছেন।
রণক্ষেত্রের বর্তমান চিত্র ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা
গত একশ দিনে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র ও অর্থনীতিতে ব্যাপক ওলটপালট হয়ে গেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে, যা পরোক্ষভাবে মার্কিন অর্থনীতিতেই মুদ্রাস্ফীতি ডেকে এনেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নিয়মিত বিরতিতে ইরানি ড্রোন ও মিসাইল ভূপাতিত করার দাবি করলেও, যুদ্ধের ময়দানে কোনো পক্ষই একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
পাক-প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির খসড়া তৈরি হলেও, কোনো পক্ষই নিজেদের শর্ত থেকে এক চুলও নড়তে রাজি হচ্ছে না। ইরান তাদের বাজেয়াপ্ত হওয়া ২৪ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন সম্পদ অবমুক্ত করার দাবি জানাচ্ছে, অপরদিকে ওয়াশিংটন চাইছে ইরান যেন তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করে। এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে আলোচনার টেবিলে এক অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি হয়েছে।
হোয়াইট হাউসে নির্বাচনী জুজু ও ট্রাম্পের অস্বস্তি
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিপাবলিকানদের চিরশত্রু ডেমোক্র্যাটরা তো বটেই, এমনকি খোদ ট্রাম্পের নিজের দলের অনেক প্রভাবশালী আইনপ্রণেতাও এখন এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন। মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ মনে করছে, দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতি সমাধান না করে কোটি কোটি ডলারের যুদ্ধাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো এক ধরনের অপচয়।
আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রিপাবলিকান স্ট্র্যাটেজিস্টরা। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প সবসময় “আমেরিকা ফার্স্ট” বা আমেরিকার স্বার্থকে সবার ওপরে রাখার কথা বলতেন। কিন্তু দূর দেশের এই যুদ্ধ সাধারণ মার্কিন ভোটারদের পকেট কাটছে, যা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার গ্রাফে বড় ধরনের ধস নামিয়েছে। হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এখন যত দ্রুত সম্ভব একটি ‘সম্মানজনক’ চুক্তি করে এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন।
বিশ্ব অর্থনীতি ও মানবিক সংকটের চরম মূল্য
১০০ দিন পেরিয়ে যাওয়া এই যুদ্ধ শুধু রাজনৈতিকভাবে ওয়াশিংটনকে কোণঠাসা করেনি, বরং বিশ্ব অর্থনীতিকেও এক মহাবিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে। জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা কোটি কোটি মানুষকে তীব্র ক্ষুধার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সাধারণ মার্কিন নাগরিকেরা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সেনাদের প্রাণহানির আশঙ্কায় দিন গুনছেন, যা ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।
এই বিষয়ের সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ কবে এবং কীভাবে শুরু হয়েছিল?
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে একটি সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট সামরিক অভিযান হিসেবে উল্লেখ করলেও পরবর্তীতে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক সংকটে রূপ নেয়।
২. যুদ্ধবিরতির আলোচনা কেন বারবার ভেস্তে যাচ্ছে?
মূলত দুই পক্ষের অনমনীয় শর্তের কারণে আলোচনা স্থবির হয়ে আছে। ইরান তাদের ওপর আরোপিত সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের হিমায়িত সম্পদ ফেরত দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধের শর্তে অনড়।
৩. এই যুদ্ধ কীভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে?
আমেরিকার সাধারণ মানুষ এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ব্যয়ভার এবং এর ফলে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতি পছন্দ করছে না। সামনেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায়, এই যুদ্ধ রিপাবলিকান পার্টির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ট্রাম্পের ভোট ব্যাংকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ – তথ্য সংযোগ
Tags: ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, ডোনাল্ড ট্রাম্প, আন্তর্জাতিক রাজনীতি





