হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেই কি মাথা ঘোরে? জেনে নিন কারণ ও প্রতিকার
সোফা বা বিছানা থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেই কি চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে? কিংবা মাথা ঝিমঝিম করে, যা কয়েক সেকেন্ড পর আবার ঠিক হয়ে যায়? এই অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। কারও আবার নামাজে সেজদা দিয়ে উঠতে গেলে মাথা ঘোরে, কারও আবার রাতে ঘুম থেকে উঠে টয়লেটে যাওয়ার সময় মাথা ঝিমঝিম করে। ডাক্তারি ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন কিংবা শরীরের অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ রক্তচাপ কমে যাওয়ার সমস্যা। আপাতদৃষ্টিতে এটি সামান্য মনে হলেও এটি আপনার শরীরের রক্তচাপ ও স্নায়ুতন্ত্রের সমন্বয়হীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
এক নজরে মূল তথ্য
-
অবস্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়াকে অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন বলে।
-
বসা বা শোয়া থেকে দ্রুত উঠে দাঁড়ালে মস্তিষ্কে সাময়িক রক্তপ্রবাহ কমে এই সমস্যা তৈরি হয়।
-
ডিহাইড্রেশন, রক্তস্বল্পতা এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এর প্রধান কারণ।
-
জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন এবং ধীরগতির মুভমেন্টের মাধ্যমে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
কেন হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে?
আমরা যখন বসা বা শোয়া অবস্থা থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়াই, তখন অভিকর্ষজ বল বা গ্রাভিটির টানে শরীরের রক্ত নিচের দিকে, বিশেষ করে পায়ের দিকে জমা হতে চায়। এর ফলে হার্ট বা হৃৎপিণ্ড থেকে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলের পরিমাণ সামান্য সময়ের জন্য কিছুটা কমে যায়। সুস্থ শরীরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্নায়ুতন্ত্র এই পরিস্থিতি খুব দ্রুত সামাল দেয়। এটি হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দেয় এবং রক্তনালিকে সংকুচিত করে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখে। কিন্তু যখন এই সমন্বয় প্রক্রিয়ায় কিছুটা দেরি হয়, তখনই মাথা ঘোরার মতো অনুভূতি তৈরি হয়।
অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন এর প্রধান কারণগুলো কী কী?
চিকিৎসকদের মতে, এই শারীরিক পরিস্থিতির পেছনে একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণ দায়ী থাকতে পারে। নিচে প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো:
১. ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা: শরীরে পর্যাপ্ত পানির অভাব হলে রক্তের সামগ্রিক ভলিউম বা পরিমাণ কমে যায়। রক্তে পানির পরিমাণ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই রক্তচাপ হ্রাস পায়, যা এই সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দেয়।
২. রক্তস্বল্পতা ও ডায়াবেটিস: শরীরে আয়রনের ঘাটতি বা অ্যানিমিয়া থাকলে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হয়। আবার দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিসের কারণে শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা রক্তচাপের ভারসাম্য ঠিক রাখতে বাধা দেয়।
৩. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন), হৃদ্রোগ কিংবা মানসিক অবসাদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ অনেক সময় শরীরের রক্তচাপকে খুব দ্রুত কমিয়ে দেয়। ফলে অবস্থান পরিবর্তন করলেই মাথা ঘোরার সমস্যা দেখা দেয়।
৪. স্নায়বিক ও কানের সমস্যা: পারকিনসন বা মাল্টিপল সিস্টেম অ্যাট্রোফির মতো জটিল স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে স্নায়ুতন্ত্র রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সাধারণের চেয়ে বেশি সময় নেয়। এছাড়া আমাদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করার প্রধান কেন্দ্র হলো কান। কানের ভেতরে কোনো ইনফেকশন বা সমস্যা হলে এই মাথা ঝিমঝিম করার প্রবণতা বেড়ে যায়।
এই সমস্যা থেকে মুক্তির সহজ ঘরোয়া উপায়
দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
ধীরে সুস্থে ওঠার অভ্যাস করুন
বসা বা শোয়া অবস্থা থেকে কখনো এক ঝটকায় বা দ্রুত গতিতে উঠে দাঁড়াবেন না। বিছানা ছাড়ার আগে প্রথমে কয়েক সেকেন্ড বসে পা নড়াচড়া করুন, তারপর ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ান। ঘুম থেকে ওঠার পর অন্তত এক-দুই মিনিট বিছানার এক পাশে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা অত্যন্ত ভালো এবং কার্যকরী একটি অভ্যাস।
পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার গ্রহণ
সারা দিন শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন। শরীরে লবণ ও পানির সঠিক ভারসাম্য বজায় না থাকলে রক্তচাপ হঠাৎ ড্রপ করতে পারে। বিশেষ করে গরমের দিনে বা অতিরিক্ত ঘাম হলে ওরাল স্যালাইন বা ডাবের পানি পানের মাধ্যমে শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য ঠিক রাখুন।
পেশির হালকা ব্যায়াম
যদি কাজের প্রয়োজনে দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তবে একেবারে স্থির হয়ে না থেকে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে একটু ওঠানামা করুন। এতে পায়ের পেশিগুলো সক্রিয় হয় এবং নিচের দিকে জমে থাকা রক্তকে ওপরের দিকে, অর্থাৎ হৃৎপিণ্ডের দিকে ঠেলে দিতে সাহায্য করে।
এই বিষয়ের সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন কি কোনো মারাত্মক রোগ?
না, সাধারণত এটি কোনো মারাত্মক রোগ নয়, বরং এটি একটি শারীরিক লক্ষণ। তবে এটি বারবার হতে থাকলে পড়ে গিয়ে মারাত্মক আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি থাকে। যদি মাথা ঘোরার পাশাপাশি বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অজ্ঞান হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
২. রাতে বা সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময়ই কেন এটি বেশি হয়?
আমরা যখন দীর্ঘক্ষণ শুয়ে থাকি, তখন রক্ত সারা শরীরে সমানভাবে বিন্যস্ত থাকে। তাছাড়া রাতে দীর্ঘ সময় পানি না খাওয়ায় সকালে শরীর কিছুটা ডিহাইড্রেটেড থাকে। এই অবস্থায় হুট করে বিছানা থেকে উঠলে মাধ্যাকর্ষণের কারণে রক্ত মস্তিষ্কে দ্রুত পৌঁছাতে পারে না, ফলে সকালে এই সমস্যা বেশি অনুভূত হয়।
৩. কোন ধরণের রোগীদের এই বিষয়ে বেশি সতর্ক থাকা উচিত?
বয়স্ক ব্যক্তি, বিশেষ করে যাদের বয়স ৬৫ বছরের বেশি, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। এছাড়া যারা নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খান, ডায়াবেটিসের রোগী এবং যারা দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকেন, তাদের এই বিষয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন – তথ্য সংযোগ
Tags: অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন, হঠাৎ মাথা ঘোরা, রক্তচাপ কমে যাওয়া, স্বাস্থ্য টিপস





