জাতীয় ফিচার

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল

শেখ হাসিনা-newsedge24

জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। আজ রোববার (১ জুন) দুপুর ১২টায় ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার বরাবর এই অভিযোগ দাখিল করা হয়, যা গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে। শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এই মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির পুনর্বহালের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়, যা পরবর্তীতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দাবিতে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই আন্দোলন দমনে সরকার, আওয়ামী লীগের দলীয় ক্যাডার, এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে বলে অভিযোগ উঠেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়, যার অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে। এর মধ্যে ১২-১৩% শিশু এবং ৪৪ জন পুলিশ সদস্য ছিলেন।

১২ মে ২০২৫-এ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা চিফ প্রসিকিউটর বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এই প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের পর আজ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, এবং চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন প্রত্যক্ষভাবে নির্দেশ দিয়ে এবং পরোক্ষভাবে সমর্থন করে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের মাধ্যমে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছেন।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আরও দুটি উল্লেখযোগ্য মামলা রয়েছে:

  • গুম ও হত্যা: আওয়ামী লীগের ১৫.৫ বছরের শাসনামলে গুম ও হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা সরাসরি গুম ও হত্যার নির্দেশ দিতেন এবং এসব ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন।
  • শাপলা চত্বর গণহত্যা: ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে গুলি চালিয়ে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এছাড়া, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মোট ৩৩টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ২৭টি হত্যা, ৪টি মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা, এবং ১টি অপহরণের অভিযোগ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকার ১২ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে, যার নেতৃত্বে নিযুক্ত হন বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য এটি প্রথম মামলা। ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত ৮০টির বেশি অভিযোগ দায়ের হয়েছে, যার মধ্যে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, এবং গুমের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত।

১৭ অক্টোবর ২০২৪-এ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে এবং তাদের ১৮ নভেম্বরের মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেয়। ডিসেম্বর ২০২৪-এ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার একটি বক্তৃতাকে ‘গণহত্যা’ সংক্রান্ত বলে নিষিদ্ধ করে। এছাড়া, আদালত অবমাননার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে তিনি বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত।

শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন, এবং বাংলাদেশ সরকার তাঁর প্রত্যর্পণের জন্য ইন্টারপোলের সহায়তা চেয়েছে। ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভারত যদি প্রত্যর্পণে সহযোগিতা না করে, তবে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বিচার (ট্রায়াল ইন অ্যাবসেনশিয়া) করা হতে পারে অথবা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) মামলা দায়ের করা হতে পারে। তবে, আইসিটি আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকায় প্রত্যর্পণে জটিলতা দেখা দিতে পারে, কারণ অনেক দেশ মৃত্যুদণ্ডযুক্ত দেশে প্রত্যর্পণে অনীহা প্রকাশ করে।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র