বন্যাসম বৃষ্টি ও কাদা মাড়িয়ে শোলাকিয়ায় ১৯৯তম ঈদের জামাত
মুষলধারে বৃষ্টি, চারদিকে থৈ থৈ কাদাপানি আর প্রকৃতির চরম বৈরী আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ। প্রথা ও রেওয়াজ অনুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবার সকাল ঠিক ৯টায় বন্দুকের ফাঁকা গুলির শব্দে শুরু হয় হাজার হাজার মুসল্লির এই বৃহৎ মিলনমেলা।
ভোরের আলো ফোটার আগেই আকাশের বুক চিরে নামা বৃষ্টি যেন রূপ নেয় অঝোর ধারায়। সাধারণ সময়ে এমন দুর্যোগে মানুষ ঘরবন্দি থাকতে পছন্দ করলেও, শোলাকিয়ার টান যেন সব বাধা ভেঙে দিয়েছে। ছাতা মাথায়, পলিথিন গায়ে জড়িয়ে কিংবা সিক্ত শরীরে পাজামা-পাঞ্জাবি ভিজিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। মাঠের কোথাও গোড়ালি সমান পানি, কোথাও পিচ্ছিল কাদা; কিন্তু আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেওয়ার আকুলতার কাছে পরাস্ত হয়েছে প্রকৃতির সব ভ্রুকুটি।
এবার ঐতিহাসিক এই মাঠে অনুষ্ঠিত হলো ঈদুল আজহার ১৯৯তম জামাত। সুদীর্ঘ দুই শতাব্দীর কাছাকাছি সময় ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্যের জামাতে এবার ইমামতি করেন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ মুফতি মাওলানা আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। তাঁর সুমধুর কণ্ঠের খুতবা আর আবেগঘন মোনাজাতে কেঁদে ওঠেন উপস্থিত হাজারো লাখো মানুষ। বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি এবং দেশের সমৃদ্ধি কামনায় দুই হাত তুলে আল্লাহর দরবারে আকুতি জানান মুসল্লিরা।
ঐতিহাসিক শোলাকিয়ার ঈদ জামাত:
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও শোলাকিয়া মাঠের কিছু অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
-
ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা: এটি ছিল শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের ইতিহাসের ১৯৯তম ঈদুল আজহার জামাত, যা এর প্রাচীন ঐতিহ্যকে আরও একবার প্রমাণ করে।
-
রেওয়াজের তোপধ্বনি: প্রতি বছরের মতো এবারও জামাত শুরুর ৫ মিনিট আগে, ৩ মিনিট আগে এবং ঠিক শুরুর মুহূর্তে বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছুড়ে মুসল্লিদের কাতার সোজা করার সংকেত দেওয়া হয়।
-
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা: বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো খামতি ছিল না। মেটাল ডিটেক্টর, সিসিটিভি ক্যামেরা, আর্চওয়ে পার হয়ে শুধু জায়নামাজ ও ছাতা সঙ্গে নিয়ে মুসল্লিদের মাঠে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।
-
বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা: দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে আসা মানুষের সুবিধার্থে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস’ নামে দুটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
-
ঐক্যের প্রতীক: কাদা ও বৃষ্টির কারণে ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ভুলে একই মাদুর বা পলিথিনের ওপর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ আদায় করেন সর্বস্তরের মানুষ।
১৫ বছরের সাংবাদিকতার ক্যারিয়ারে বহু দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্ত কভার করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এই প্রতিবেদকের। তবে শোলাকিয়ার এই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভূতির জন্ম দেয়। মাঠের চারপাশের রাস্তাগুলো যখন বৃষ্টির পানিতে নদীপ্রায়, তখনো মানুষের ঢল থামেনি। জুতো হাতে নিয়ে, কাদা মাখানো পায়ে যেভাবে তরুণ থেকে বৃদ্ধ—সবাই মাঠের দিকে ধাবিত হয়েছেন, তা এক অভূতপূর্ব আত্মিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, শোলাকিয়ার ইতিহাসে এর আগেও বহুবার বৃষ্টির মধ্যে জামাত হয়েছে, তবে এবারের বৃষ্টির তীব্রতা ছিল অন্যরকম। তাসত্ত্বেও মাঠের বড় অংশ পূর্ণ হওয়া মানুষের গভীর বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসারই প্রতিফলন।
ঐতিহ্যের দ্বিশতক ছোঁয়ার অপেক্ষায় শোলাকিয়া
১৯৯তম জামাত সফলভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে শোলাকিয়া এখন দ্বিশতক অর্থাৎ ২০০ বছরের মাইলফলক ছোঁয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। এই ঐতিহাসিক মাঠ কেবল কিশোরগঞ্জের নয়, বরং গোটা বাংলাদেশের ধর্মীয় সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতীক।
প্রকৃতির প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে আজকের এই সফল জামাত প্রমাণ করে, বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় আবেগ ও ঐতিহ্য কতখানি সুগভীর। আগামী বছরগুলোতে মাঠের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন আরও জোরদার করা হলে, আবহাওয়া যেমনই থাক না কেন, দেশের এই গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যে মুসল্লিদের অংশগ্রহণ আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে—এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।





