৮৮ দিন পর ব্ল্যাকআউট কাটল ইরানে; নতুন করে বিধ্বংসী পাল্টাপাল্টি হামলা
দীর্ঘ ৮৮ দিনের নজিরবিহীন ‘ডিজিটাল অন্ধকার’ বা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট শেষে অবশেষে বিশ্বজগতের সঙ্গে যুক্ত হলো ইরান। তবে নেট দুনিয়ায় তেহরানের এই প্রত্যাবর্তন উদযাপনের সুযোগ দেয়নি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি।
সংযোগ সচল হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চিরবৈরী ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন করে বিধ্বংসী পাল্টাপাল্টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।
টানা প্রায় তিন মাস ধরে ইরানি নাগরিকরা এক প্রকার অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের অজুহাতে দেশটির সরকার ইন্টারনেট পরিষেবা পুরোপুরি ও আংশিকভাবে বন্ধ করে রেখেছিল। দীর্ঘ ৮৮ দিন পর যখন ধাপে ধাপে ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ডাটা চালু হতে শুরু করে, তখন সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি রূপ নিয়েছে চরম আতঙ্কে। পশ্চিম এশিয়ার আকাশে আবারও যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারনেট সচল করার সিদ্ধান্তটি হয়তো তেহরানের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ ছিল, যার মাধ্যমে তারা বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিল যে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে তা উল্টো ফল দিয়েছে। সাইবার দুনিয়ায় সংযোগ ফেরার পরপরই দুই দেশের সামরিক বাহিনী একে অপরের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা শুরু করে।
তেহরানের আকাশে গভীর রাতে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরান দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের বেশ কয়েকটি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে, ইসরাইলের তেল আবিব এবং হাইফা শহরের সামরিক ঘাঁটিতেও ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
এক নজরে মূল ঘটনাপ্রবাহ
চলমান এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
-
দীর্ঘতম ব্ল্যাকআউট: প্রায় তিন মাস (৮৮ দিন) ধরে ইরানের সিংহভাগ মানুষ তীব্র ইন্টারনেট সেন্সরশিপ এবং সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউটের শিকার ছিলেন, যা দেশটির ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘতম।
-
অর্থনৈতিক বিপর্যয়: এই ৮৮ দিনে ইরানের অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসা, ব্যাংকিং খাত এবং ফ্রিল্যান্সাররা বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
-
আকস্মিক হামলা: ইন্টারনেট আংশিক সচল হওয়ার মাত্র তিন ঘণ্টার মাথায় ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ইরানের কৌশলগত ঘাঁটিতে আঘাত হানে।
-
তেহরানের পাল্টা জবাব: হামলার পরপরই ইরান ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ’-এর ধারাবাহিকতায় ইসরাইলের মূল ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ও মিসাইল নিক্ষেপ করে।
-
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ: জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবিলম্বে উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে, তবে কোনো পক্ষই পিছু হটতে নারাজ।
১৫ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, আধুনিক যুদ্ধ কেবল সীমান্ত বা আকাশপথেই সীমাবদ্ধ নয়, এর একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে তথ্যপ্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ। ইরান সরকারের ইন্টারনেট সচল করার পরপরই এই ধরনের আক্রমণ ইঙ্গিত করে যে, যুদ্ধের গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রচারণামূলক লড়াইয়ে নেটওয়ার্কের ভূমিকা কতটা অপরিসীম। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইন্টারনেট সচল হওয়ার সুযোগে দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাইবার হামলাও পরিচালনা করছে।
সংকটের ভবিষ্যৎ ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব
এই পাল্টাপাল্টি হামলা কেবল ইরান বা ইসরাইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে। বিশেষ করে খনিজ তেলের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আরও আকাশচুম্বী হতে পারে।
দীর্ঘ ৮৮ দিন পর ইরানি নাগরিকরা বিশ্বের সাথে যোগাযোগের আলো পেলেও, যুদ্ধের কালো মেঘ তাদের সেই আনন্দকে মুহূর্তেই ম্লান করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এখনই কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই পাল্টাপাল্টি হামলা কেবল মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, পুরো বিশ্বকে এক দীর্ঘমেয়াদি মন্দা ও সংকটের দিকে ঠেলে দেবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।





