জাতীয় ফিচার

পিলখানা হত্যাকাণ্ড: গুম-হত্যা-নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরল তদন্ত কমিশন

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, “আমরা যখন এই তদন্ত কমিশন গঠন করি, তখন ভেবেছিলাম হয়তো কিছু ছোটখাটো বৈষম্য হয়েছে। কিন্তু আপনারা যে পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে এনেছেন, তা কল্পনার একেবারে বাইরে, রীতিমতো ভয়াবহ।”

রোববার (৩০ নভেম্বর) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় পিলখানা হত্যাকাণ্ডের (২০০৯) পরবর্তী সময়ে সশস্ত্র বাহিনীতে বৈষম্য-নিপীড়নের শিকারদের তদন্তে গঠিত জাতীয় স্বাধীন কমিশনের প্রতিবেদন গ্রহণকালে তিনি এ কথা বলেন। প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের প্যানেল।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক তথ্য:

মোট ৭৩৩টি অভিযোগ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৪০৫টি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।

কমিশন ১৪৫ জন কর্মকর্তার পক্ষে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছে: সেনাবাহিনী ১১৪ জন, নৌবাহিনী ১৯ জন, বিমানবাহিনী ১২ জন।

এদের মধ্যে ৪ জনকে চাকরিতে পুনর্বহাল, বাকিদের স্বাভাবিক অবসর, পদোন্নতি, অবসরপূর্ব পদোন্নতি, বকেয়া বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্তে বেরিয়ে আসা কিছু নজিরবিহীন নৃশংসতা:

৬ জন অফিসারকে আত্মীয়-স্বজনের রাজনৈতিক পরিচয় বা ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে ১ থেকে ৮ বছর পর্যন্ত গুম করে রাখা হয়েছিল।

একজন অবসরপ্রাপ্ত অফিসারকে সাজানো ‘জঙ্গি নাটক’-এ নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়; তার স্ত্রীকে এক বছরের শিশুসন্তানসহ বিনা বিচারে ৬ বছর কারাগারে রাখা হয়।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সময় সরকারের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনাকারী ৫ জন অফিসারের বিরুদ্ধে সাজানো ‘ব্যারিস্টার তাপস হত্যাচেষ্টা’ মামলা দিয়ে চরম নির্যাতন করা হয়।

১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ডিজিএফআইতে কর্মরত ৫ জনকে মিথ্যা অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দরবারে হট্টগোলের জন্য ৫ জনকে দায়ী করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে বরখাস্ত।

৪ জন কনিষ্ঠ অফিসারকে নামাজ-দাড়ি-টুপির কারণে ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়।

মোট ২৮ জনকে গুম, অপহরণ, অবৈধ আটক, অমানুষিক নির্যাতন, পরিবারের ওপর লাঞ্ছনা ও বিপুল আর্থিক ক্ষতির শিকার করা হয়।

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস স্পষ্ট জানান, “বিগত সরকারের আমলে যেসব সেনা-নৌ-বিমানবাহিনীর সদস্য অন্যায়ভাবে বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, অন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো তাদের প্রতিও পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।”

প্রতিবেদন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সহকারী লে. জে. (অব.) আব্দুল হাফিজ, কমিশন সদের সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) মুহম্মদ শামস-উল-হুদা, মেজর জেনারেল (অব.) শেখ পাশা হাবিব উদ্দিন, রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মোহাম্মদ শফিউল আজম ও এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মুহাম্মদ শাফকাত আলী।

কমিশন গত ১৯ আগস্ট থেকে কাজ শুরু করে মাত্র সাড়ে তিন মাসের মধ্যে এই বিশাল প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সরকার এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করবে বলে জানা গেছে।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র