নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বাঙ্কারে আশ্রয় নিচ্ছেন সৌদি যুবরাজ, মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা
নিরাপত্তাঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকায় সাধারণ বাসস্থান ছেড়ে সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার-সুবিধাযুক্ত প্রাসাদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সীমান্ত সংঘাত ও আকাশপথে দফায় দফায় মিসাইল আক্রমণের ঘটনায় পুরো রিয়াদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সৌদি আরবের শীর্ষ নেতৃত্বের এই গোপন অবস্থান পরিবর্তন পুরো অঞ্চলের সামরিক সমীকরণকে নতুন করে জটিল করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর সূত্র অনুযায়ী, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি সামরিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সৌদি আরবের ভেতরের নিরাপত্তা কাঠামোতে। রাজধানী রিয়াদ এবং দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বাঁচতে এয়ার ডিফেন্স প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা হলেও তা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত করতে পারছে না প্রশাসনকে। এই সংকটময় অবস্থায় দেশের সর্বোচ্চ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সৌদি যুবরাজ-কে নিরাপদ কোনো সামরিক শক্তঘাঁটিতে বাঙ্কার সুবিধার মধ্যে রাখা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা ছিল না।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, সাধারণ প্রাসাদগুলো মিসাইল হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঝুঁকি থাকায় অত্যন্ত সীমিতসংখ্যক বিশ্বস্ত দেহরক্ষী ও সামরিক কমান্ডারের বলয়ে তাকে নির্দিষ্ট সময় পরপর সুরক্ষিত বাঙ্কার সম্বলিত প্রাসাদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে করে সাধারণ নাগরিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে, যা রিয়াদের দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিকে জোর ধাক্কা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় হঠাৎ এই ভয়াবহ ধসের প্রধান কারণ আকাশপথের ক্রমাগত আগ্রাসন। রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনায় অতর্কিত মিসাইল হানায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। পেট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের অভাব এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বারবার সরাতে গিয়ে যে কারিগরি বিড়ম্বনা দেখা দিচ্ছে, তা দেশটির সামরিক সদরদপ্তরকে ভাবিয়ে তুলেছে।
এমন অবস্থায় স্বাভাবিক বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বেসামরিক জনগণের মাঝে চরম আতঙ্ক কাজ করছে। দেশের এই জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলছে। কিন্তু প্রকাশ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি না থাকায় সৌদি যুবরাজ বাস্তবে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন, তা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে নানা গুঞ্জন ডালপালা মেলছে।
এই চরম সামরিক নিরাপত্তাহীনতার সরাসরি কুফল হিসেবে ধাক্কা খাচ্ছে সৌদির তেলনির্ভরতা কমানোর ঐতিহাসিক মহাপরিকল্পনা। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে যে মেগা শহর ‘নিওম’ (NEOM) ও বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, এই যুদ্ধের আবহে তা থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখছেন।
একসময় পর্যটন ও বিনোদনের নিরাপদ কেন্দ্র গড়ে তোলার যে স্বপ্ন বিশ্বকে দেখানো হচ্ছিল, তা হঠাৎ করেই মিসাইল ও বাঙ্কার আতঙ্কে ঢেকে গেছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্যের আন্তর্জাতিক আকাশসীমা ও সীমান্ত এলাকায় যুদ্ধবিরতি বা শান্তি ফিরিয়ে আনা না যায়, তবে সৌদি অর্থনীতি এক বড় ধরনের মন্দার মুখোমুখি হতে বাধ্য।
সংকট মোকাবেলায় রিয়াদ এখন তার পরাশক্তি মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অন্যান্য মিত্র দেশের দিকে তাকিয়ে আছে। ওয়াশিংটন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা জানালেও প্রত্যক্ষ সামরিক সহযোগিতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি দেখাচ্ছে। একই সাথে আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করতে বিকল্প পরাশক্তিগুলোর দুয়ারে ধরণা দিতে বাধ্য হচ্ছে সৌদির সামরিক বিভাগ।





