‘তাঁরা আমাদের গর্ব, আমাদের আদর্শ’: নিহত শিক্ষকদের স্মরণে প্রধান উপদেষ্টা
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় নিহত তিন শিক্ষক মাহেরীন চৌধুরী, মাসুকা বেগম ও মাহফুজা খানম মানবতা ও সাহসিকতার অসাধারণ দৃষ্টান্ত হিসেবে জাতির কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
তিনি বলেন, ‘এই তিন শিক্ষক আমাদের গর্ব এবং আদর্শ। তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের প্রত্যেকের মনে গভীর প্রশ্ন জাগিয়েছে—আমরা কি তাঁদের মতো শিশুদের জীবন বাঁচাতে নিজেদের বিসর্জন দিতে পারতাম?’
আজ মঙ্গলবার বিকেলে নিহত শিক্ষকদের পরিবারের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘এই ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পার হলেও এই শোক সবার হৃদয়ে দগদগে রয়েছে। ঘটনার পরপরই আমি আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আপনারা যে দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন দেখা করা ঠিক মনে করিনি। আমরা আপনাদের প্রতি সমবেদনা জানাতে পারি, কিন্তু এই শোকের ক্ষত মুছে দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে এই শোক শুধু আপনাদের একার নয়, পুরো জাতি এই শোক বহন করছে।’
বৈঠকে তিন শিক্ষকের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের প্রিয়জনের স্মৃতিচারণ করেন। মাহেরীন চৌধুরীর স্বামী মনসুর হেলাল বলেন, ‘হাসপাতালে নেওয়ার সময় ফোনে তার সঙ্গে আমার কথা হয়। বার্ন ইনস্টিটিউটে যে দৃশ্য দেখেছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তার শরীরের একপাশ পুরোপুরি পুড়ে গিয়েছিল।
কয়েকজন আহত শিশু আমাকে বলল, “মিস আমাদের টেনে বের করেছেন। মিস তো সুস্থ ছিলেন, তাহলে এমন হলো কেন?” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি নিজে বেরিয়ে আসলে না কেন? তোমার দুই সন্তানের কথা ভাবলে না?” সে বলল, “ওরাও তো আমার সন্তান। ওদের ফেলে আমি কীভাবে চলে আসব?” পৃথিবীর সবাই তার জন্য দোয়া করেছে। সে ছিল মানবতার প্রতীক।’
মাহফুজা খানমের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মা অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। আমি ভেবেছিলাম, মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরব। যেদিন মাকে হুইলচেয়ারে বসিয়েছিলাম, মনে হয়েছিল আমি বিশ্ব জয় করেছি। কিন্তু মা চলে গেলেন। আমার বাবা নেই, এখন মাও নেই। আমি এতিম হয়ে গেলাম। মা ছাড়া বাসায় ফিরতে পারিনি।’
মাসুকা বেগমের ভগ্নিপতি খলিলুর রহমান বলেন, ‘মাসুকা তার বাবা ও অসুস্থ বোনের জন্য সবসময় সর্বোচ্চ চেষ্টা করত। বাবার জন্য নিয়মিত হাতখরচ পাঠাত। আমার সন্তানদের নিজের সন্তানের মতো দেখত। তার জীবন ছিল স্কুল আর পরিবার নিয়ে।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘তাঁদের কথা শুনে কষ্ট হয়, আবার গর্বও হয়। আমাদের দেশে এমন মানুষ আছেন, যারা শিশুদের বাঁচাতে আগুনে ঝাঁপ দিয়েছেন। তাঁরা মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁরা আমাদের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছেন—আমরা কি তাঁদের মতো সাহস দেখাতে পারতাম? তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখতে আমরা সব ধরনের পদক্ষেপ নেব।’ তিনি আরও জানান, নিহত শিক্ষকদের পরিবারের জন্য আর্থিক ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে এবং তাঁদের স্মৃতি রক্ষায় স্কুলে একটি স্মারক স্থাপনের পরিকল্পনা চলছে।
বৈঠকে মাহেরীন চৌধুরীর দুই ছেলে আদিল ও আয়ান রশিদ, বোন মেহেতাজ চৌধুরী, ভাই মুনাফ মজিব চৌধুরী ও আত্মীয় কাওসার হোসেন চৌধুরী; মাসুকা বেগমের বোন পাপড়ি রহমান; মাহফুজা খানমের বোন মুরশিদা খাতুন, ভাগনে মো. মাইদুল ইসলাম ও আত্মীয় হুমায়ূন কবির উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ, সড়ক পরিবহন ও বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার, গৃহায়ণ উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং এসডিজি–বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন।





