চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নয়, মনোজগৎ নির্মাণের হাতিয়ার: তথ্যমন্ত্রী
চলচ্চিত্রকে কেবল অলস সময়ের বিনোদন হিসেবে না দেখে একে মানুষের চিন্তাধারা ও মনোজগৎ পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে অভিহিত করেছেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
সোমবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনে আয়োজিত ‘সত্যজিৎ রায় উৎসব-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সোমবার দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী জহির রায়হান মিলনায়তনে দুই দিনব্যাপী এই উৎসবের পর্দা ওঠে। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টিসম্ভারকে তরুণ প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই বিশেষ আয়োজন। অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী বলেন, “একটি সৃষ্টিশীল কাজ, তা সে চলচ্চিত্র হোক কিংবা সাহিত্য, মানুষের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম। ভালো চলচ্চিত্র সমাজকে আয়না দেখায় এবং মানুষের চিন্তার বদ্ধ দুয়ার খুলে দেয়।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে চলচ্চিত্রের সংজ্ঞায় পরিবর্তন এলেও এর অন্তর্নিহিত শক্তি অপরিবর্তিত। তথ্যমন্ত্রীর মতে, চলচ্চিত্র কেবল পর্দার কিছু চলমান দৃশ্য নয়, বরং এটি একটি জাতির সংস্কৃতি ও আদর্শের প্রতিফলন। সত্যজিৎ রায়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, কীভাবে বিশ্বমানের চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে একটি দেশ ও তার মাটিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা যায়, তা সত্যজিৎ আমাদের শিখিয়ে গেছেন।
শিল্প ও মননশীলতার মেলবন্ধন
অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তারা বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি সাংস্কৃতিক চারণভূমিতে এ ধরনের উৎসব আয়োজন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জহির উদ্দিন স্বপন তার বক্তব্যে বই পড়ার গুরুত্ব এবং চলচ্চিত্রের নান্দনিক দিকগুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তরুণ সমাজ যদি সৃজনশীল কাজ বা উচ্চমানের চলচ্চিত্রের সংস্পর্শে থাকে, তবে তাদের মধ্যে উগ্রবাদ বা নেতিবাচক চিন্তা দানা বাঁধতে পারবে না।
মন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমানে বাণিজ্যিকিকরণের চাপে অনেক সময় চলচ্চিত্রের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। তবে সত্যজিতের মতো নির্মাতাদের কাজ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সস্তা বিনোদনের ঊর্ধ্বে উঠেও মানুষের হৃদয় জয় করা সম্ভব। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র চর্চায় আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।
‘সত্যজিৎ রায় উৎসব-২০২৬’: এক নজরে মূল বিষয়গুলো
দুই দিনব্যাপী চলমান এই উৎসবে যা যা থাকছে:
-
চলচ্চিত্র প্রদর্শনী: সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী সিনেমাগুলোর বিশেষ স্ক্রিনিং।
-
আলোচনা সভা: চলচ্চিত্র সমালোচনা ও নির্মাণশৈলী নিয়ে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের আলোচনা।
-
আলোকচিত্র প্রদর্শনী: সত্যজিতের কর্মজীবন ও দুর্লভ কিছু স্থিরচিত্রের প্রদর্শনী।
-
অংশগ্রহণ: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও দেশবরেণ্য চলচ্চিত্রকার ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের উপস্থিতি।
-
লক্ষ্য: নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের মধ্যে ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের রুচি তৈরি করা।
আগামীর চলচ্চিত্র ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন তার বক্তৃতার শেষাংশে চলচ্চিত্রের সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটাতে সরকার বদ্ধপরিকর।
বিশেষ করে চলচ্চিত্র শিল্পকে চাঙ্গা করতে আধুনিকায়ন ও অনুদান প্রদানের ক্ষেত্রে মেধা ও সৃজনশীলতাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। তিনি মনে করেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আয়োজন সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি ইতিবাচক বার্তা পাঠাবে।
সংস্কৃতি ও মননশীলতার এই মিলনমেলা কেবল স্মৃতিচারণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র প্রেমীদের জন্য এক বিশাল শিক্ষার ক্ষেত্র। তথ্যমন্ত্রীর এই বলিষ্ঠ বক্তব্য এবং সত্যজিৎ রায়ের দর্শনের প্রতিফলন ঘটিয়ে উৎসবটি প্রথম দিনেই প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।





