অর্থ-বাণিজ্য ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

কার্ডে লেনদেনের পাহাড়সম মাইলফলক বাংলাদেশে

কার্ডে লেনদেনের পাহাড়সম মাইলফলক বাংলাদেশে

এমএফএস ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের জয়জয়কারের মধ্যেও বাংলাদেশে প্লাস্টিক মানি বা কার্ডের ব্যবহার অবিশ্বাস্য গতিতে বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে কার্ড ইস্যুর হার ১১১ শতাংশ এবং লেনদেন ১৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে কার্ডের সংখ্যা ৫ কোটি ১৬ লাখ ছাড়িয়েছে, যেখানে মাসিক লেনদেন ছুঁয়েছে ৫১ হাজার কোটি টাকা।

নগদহীন অর্থনীতির পথে এক বিশাল লাফ

দেড় দশক আগে মানিব্যাগে মোটা গদি করা নোট রাখা ছিল আভিজাত্যের লক্ষণ। কিন্তু প্রযুক্তির বিবর্তনে সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে পাতলা প্লাস্টিকের কার্ড। বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) যখন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে, তখন মনে করা হয়েছিল কার্ডের জৌলুস হয়তো কমবে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

২০২৬ সালের শুরুতে দাঁড়িয়ে দেশের মানুষের হাতে থাকা কার্ডের সংখ্যা এখন ৫ কোটি ১৬ লাখ ৭৭ হাজার ২৫৬টি। এই বিপুল সংখ্যক কার্ড কেবল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পরিচয়পত্র হিসেবে আলমারিতে পড়ে নেই, বরং এগুলো দিয়ে প্রতি মাসে হাজার হাজার কোটি টাকার কেনাকাটা ও লেনদেন হচ্ছে। গত জানুয়ারি মাসেই কার্ডের মাধ্যমে খরচের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা।

লেনদেনের গতিপ্রকৃতি: মানুষ আসলে কিনছে কী?

প্রশ্ন জাগতে পারে, এত টাকা মানুষ কার্ড দিয়ে কোথায় খরচ করছে? বাজার বিশ্লেষণ ও ব্যাংকারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কার্ড ব্যবহারের ধরনে এসেছে আমূল পরিবর্তন। আগে কার্ড মানেই ছিল কেবল এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলা। কিন্তু এখন সুপারশপ, রেস্তোরাঁ, হাসপাতালের বিল এমনকি পাড়ার মুদি দোকানেও কার্ড ঘষছেন গ্রাহকরা।

বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার প্রয়োজনে। বিমান টিকিট কেনা, হোটেল বুকিং এবং ইলেকট্রনিক গ্যাজেট কেনার ক্ষেত্রে কিস্তি সুবিধা (EMI) থাকায় মানুষ কার্ডে লেনদেন করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। অন্যদিকে, সাধারণ কেনাকাটা ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধে ডেবিট কার্ডের ব্যবহার এখন শহর ছাড়িয়ে মফস্বলেও ছড়িয়ে পড়েছে।

একনজরে কার্ড বিপ্লবের পরিসংখ্যান

দেশের আর্থিক খাতের এই রূপান্তরকে বুঝতে নিচের তথ্যগুলো সহায়ক হতে পারে:

  • বিস্ময়কর প্রবৃদ্ধি: গত পাঁচ বছরে কার্ড ইস্যু বেড়েছে ১১১ শতাংশ এবং লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ১৫৯ শতাংশ।

  • কার্ডের সংখ্যা: বর্তমানে দেশে মোট কার্ডের সংখ্যা ৫.১৬ কোটির বেশি।

  • লেনদেনের বিশালতা: জানুয়ারি মাসে এক মাসেই লেনদেন হয়েছে প্রায় ৫১,০০০ কোটি টাকা।

  • জনপ্রিয়তা: লেনদেনের শীর্ষে রয়েছে ডেবিট কার্ড, তবে প্রবৃদ্ধির হারে এগিয়ে রয়েছে ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড।

কেন বাড়ছে কার্ডের জনপ্রিয়তা?

অর্থনীতিবিদদের মতে, কার্ডের এই উত্থানের পেছনে কাজ করছে নিরাপত্তা ও সুবিধার মেলবন্ধন। নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি যেমন নেই, তেমনি ব্যাংকগুলো এখন কার্ডে কেনাকাটায় ক্যাশব্যাক, রিওয়ার্ড পয়েন্ট ও বিভিন্ন উৎসবে বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। এছাড়া ই-কমার্স বা অনলাইন শপিংয়ের প্রসারের কারণে কার্ড ছাড়া জীবন এখন প্রায় অচল। আগে অনলাইনে কেনাকাটায় ডেলিভারি নেওয়ার সময় নগদ টাকা দিতে হতো, এখন সিংহভাগ মানুষ অগ্রিম কার্ড পেমেন্ট করতে পছন্দ করেন।

ইন্টারনেট ব্যাংকিং অ্যাপগুলোর সাথে কার্ডের সরাসরি সংযোগ থাকায় গ্রাহকরা এখন নিমেষেই এক কার্ড থেকে অন্য কার্ডে টাকা পাঠাতে পারছেন বা ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ করছেন। এই ‘ইকোসিস্টেম’ তৈরি হওয়ার ফলে মানুষের ব্যাংকিং ভীতি দূর হয়েছে।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ব্যবসা-বাণিজ্য

২৫০ কর্মীর অসুস্থতায় বন্ধ হওয়া অ্যাপলের প্রতিষ্ঠান চালু হচ্ছে

নিম্নমানের খাবার খেয়ে ২৫০ জন কর্মী অসুস্থ হওয়ার প্রায় ১ মাস পর চালু হতে যাচ্ছে অ্যাপলের পণ্য সরবরাহকারী ফক্সকনের চেন্নাই