ভোক্তাপর্যায়ে দেশের বাজারে নতুন মাস অর্থাৎ নভেম্বর জুড়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে জারিকৃত অফিশিয়াল প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র অনুযায়ী, বিগত মাসে নির্ধারিত দরেই পুরো নভেম্বর মাস জুড়ে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রি অব্যাহত থাকবে। বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যের ওঠানামা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের সাধারণ ও মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে এই দর বহাল রাখা হয়েছে। আজ ১ নভেম্বর থেকে নতুন এই মূল্যতালিকা সারা দেশের সকল ফিলিং স্টেশন ও পাম্পে একযোগে কার্যকর করা হচ্ছে।
সংবাদের মূল বিষয়সমূহ:
• বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ নভেম্বর ২০২৬ মাসের জন্য সব ধরনের তেলের দাম একই রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
• ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা দরে বিক্রি হবে।
• প্রতি লিটার অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১৬০ টাকা অপরিবর্তিত বহাল রয়েছে।
• আন্তর্জাতিক বাজারে ফ্রেইট চার্জ বৃদ্ধি পেলেও দেশের বাজারে নতুন করে কোনো চাপ সৃষ্টি করা হয়নি।
নভেম্বর মাসের সর্বশেষ অফিশিয়াল মূল্যতালিকা
সাধারণ ক্রেতা এবং পরিবহন চালকদের সুবিধার্থে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনটি পর্যালোচনার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট খুচরা মূল্য তালিকা নিশ্চিত করা গেছে। নতুন আদেশের পর দেশের বাজারে প্রধান চার ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্যের দর নিচে বিস্তারিত উল্লেখ করা হলো:
• ডিজেল: প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা।
• অকটেন: প্রতি লিটার ১৬৫ টাকা।
• পেট্রোল: প্রতি লিটার ১৬০ টাকা।
• কেরোসিন: প্রতি লিটার ১৫৫ টাকা।
মন্ত্রণালয়ের প্রবীণ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর মাসের বড় ধরনের মূল্য সমন্বয়ের পর বাজার পরিস্থিতি এবং সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করে এই টানা দ্বিতীয় মাসের মতো জ্বালানি তেলের দাম একই রাখার কৌশলগত পথে হেঁটেছে প্রশাসন।
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলা
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতিনিয়ত ওঠানামা করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে ফ্রেইট চার্জ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলায় মূল্য নির্ধারণের নিয়ম চালু করলেও, এবার দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দাম না বাড়ানোর বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বাজারে একলাফে লিটারে বড় ধরনের সমন্বয় করা হয়েছিল তেলের দাম। সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে দাম বাড়লে তা সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিত বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পরিবহন ও কৃষিখাতে স্বস্তির নিঃশ্বাস
নভেম্বর মাস থেকেই দেশের অনেক অঞ্চলে রবিশস্য চাষের প্রস্তুতি এবং বোরো ধানের জন্য সেচ পাম্প চালুর প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেচ কাজের সিংহভাগ পাম্প ডিজেল চালিত হওয়ায় এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের প্রান্তিক কৃষকেরা বড় ধরনের বাড়তি খরচের হাত থেকে বেঁচে গেলেন। একই সাথে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের গণপরিবহন ও ট্রাক মালিক সমিতিও সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছে।
সড়ক পরিবহন নেতাদের মতে, তেলের দাম নতুন করে না বাড়ায় দূরপাল্লার ও অভ্যন্তরীণ রুটের বাস বা ট্রাকের ভাড়া বৃদ্ধির কোনো সুযোগ থাকছে না, যা সাধারণ যাত্রীদের পকেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে না।
দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো দাবি করছে, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণ ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের মজুত রয়েছে, যা দিয়ে আগামী কয়েক মাসের অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনায়াসে মেটানো সম্ভব। তবে বিশ্ববাজারে যদি অপরিশোধিত তেলের দাম আরও দীর্ঘ সময় ধরে চড়া থাকে, তবে পরবর্তী মাসগুলোতে এই মূল্য ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি (LNG) এবং জ্বালানি তেল আমদানির জন্য বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোর সাথে সরাসরি চুক্তি ও কূটনীতি অব্যাহত রেখেছে। সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা, আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও যেন দ্রুত তেলের দাম হ্রাস করার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।