এআই খাতে মেটার অর্থায়ন পরিকল্পনার আওতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অবকাঠামো এবং সুপারইন্টেলিজেন্সের অভাবনীয় উন্নয়নে নতুন করে ৯ হাজার ৫০০ কোটি (৯৫ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে মেটা প্ল্যাটফর্মস। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপের এই অভিভাবক প্রতিষ্ঠানটি সোমবার (২৬ অক্টোবর, ২০২৬) মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) ফাইলিংয়ে এই মেগা তহবিল সংগ্রহের তথ্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে
। বিশ্বজুড়ে বিগ টেক জায়ান্টদের মধ্যে চলতে থাকা এআই প্রযুক্তির একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের দৌড়ে নিজেদের সবচেয়ে এগিয়ে রাখতেই মেটার সিইও মার্ক জাকারবার্গ এই বিশাল আর্থিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন。
একনজরে মেটার মেগা প্রজেক্টের মূল তথ্যসমূহ
- তহবিলের আকার: মেটা নতুন শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে মোট ৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করবে।
- অর্থায়নের প্রথম ধাপ: শুরুতেই আন্ডাররিটেন পাবলিক ইক্যুইটি অফারিংয়ের মাধ্যমে ৩৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হবে।
- ভবিষ্যত পরিকল্পনা: পরবর্তী ধাপে ‘অ্যাট-দ্য-মার্কেট’ (এটিএম) প্রোগ্রামের আওতায় আরও ৬০ বিলিয়ন ডলারের নন-ভোটিং শেয়ার বাজারে ছাড়া হবে।
- প্রধান সহযোগী: মেটার এই শেয়ার ক্রয়ে চিপ নির্মাতা জায়ান্ট এনভিডিয়া, এএমডি এবং ব্রডকম ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে।
- পূঁজিবাজারে প্রভাব: এই ঘোষণার পরপরই বিনিয়োগকারীদের মাঝে শেয়ার লঘু (ডাইলুশন) হওয়ার আশঙ্কায় ওয়াল স্ট্রিটে মেটার শেয়ারের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে গেছে।
এআই খাতে মেটার অর্থায়ন ও বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা
মেটা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংগৃহীত এই বিপুল অর্থ প্রধানত কোম্পানির কোর বিজনেস এবং উদীয়মান এআই প্রযুক্তির পেছনে ব্যয় করা হবে। বিশেষ করে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের এআই অ্যালগরিদম উন্নত করা, তাদের নতুন এআই এজেন্ট ‘মিউজ’ (Muse)-এর সম্প্রসারণ এবং অতি শক্তিশালী মেগা ডেটা সেন্টার তৈরিতে এই মূলধন কাজে লাগানো হবে। তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের সাম্প্রতিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারের ইক্যুইটি বিক্রির পর মেটার ওপর এই অর্থায়নের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়েছিল।
এই বিশাল ফান্ড জোগাড় করার পেছনে মেটার আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো ভবিষ্যৎ সুপারইন্টেলিজেন্স এবং অ্যাডভান্সড লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (LLM) প্রশিক্ষণ গতিশীল করা। ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রোপিকের মতো ফ্রন্টরানার এআই স্টার্টআপগুলোর সাথে পাল্লা দিতে মেটার এখন বিশাল কম্পিউটিং পাওয়ার বা প্রসেসর প্রয়োজন। আর এ কারণেই টেক্সাস বা উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে মেটা নিজস্ব বিশাল সব সুপারক্লাস্টার ডেটা সেন্টার তৈরির কাজ রাতারাতি বাড়াতে যাচ্ছে।
শেয়ার বিক্রির ধরণ ও বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্ব
নিলম্বিত বা আন্ডাররিটেন অফারিংয়ের মাধ্যমে মেটা ২২.৫ বিলিয়ন ডলারের ক্লাস এ সাধারণ শেয়ার এবং ১২.৫ বিলিয়ন ডলারের রূপান্তরযোগ্য প্রিফার্ড শেয়ার বা বন্ড ছাড়বে। এর বাইরে মেটার তৈরি করা নতুন নন-ভোটিং ক্লাস সি শেয়ার বিক্রি হবে আরও ৬০ বিলিয়ন ডলারের, যা ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিক থেকে বাজারে আসার কথা রয়েছে। এই ব্যবস্থার ফলে কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের ভোটিং পাওয়ার বা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কোনোভাবেই কমবে না।
যদিও নগদ প্রবাহ বা অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো ভালো থাকা সত্ত্বেও মেটার ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার (ক্যাপেক্স) বা মূলধনী ব্যয় বৃদ্ধির পূর্বাভাস বিনিয়োগকারীদের কিছুটা ভাবিয়ে তুলেছে। ২০২৬ সালের জন্য মেটা তাদের মোট ক্যাপেক্স প্রাক্কলন বাড়িয়ে ১৩৫ বিলিয়ন থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। এই বিপুল ব্যয়ের কারণে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা মুনাফা কম পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়লেও ভবিষ্যতের এআই বিপ্লবে মেটাই লাভবান হবে বলে আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা।
শীর্ষ চিপ নির্মাতাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা
এআই খাতে মেটার অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো বিশ্বের শীর্ষ চিপ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর সরাসরি অংশ নেওয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল চালিকাশক্তি জিপিইউ (GPU) সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া, অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেস (এএমডি) এবং ব্রডকম যৌথভাবে মেটার শেয়ারে ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এটি মূলত চিপ সরবরাহ চেইন এবং ডেটা সেন্টার ইকোসিস্টেমে মেটার বিশ্বস্ততাকে আরও মজবুত করবে।
চিপ নির্মাতাদের এই কৌশলগত অবস্থান প্রমাণ করে যে আগামী দিনগুলোতে এআই চিপের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে মেটাই রাজত্ব করতে যাচ্ছে। মেটা নিজস্ব এআই ল্যাব এবং ‘সুপারইন্টেলিজেন্স ল্যাবস’-এর মাধ্যমে নিজস্ব ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে যা বিজ্ঞাপনদাতাদের আরও নিখুঁত টার্গেটিং সুবিধা দেবে। ফলে এই বিপুল বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত মেটার মূল বিজ্ঞাপন রাজস্ব বা রেভিনিউ আরও অনেক বাড়িয়ে দেবে বলেই কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করছেন।
ডেটা সেন্টারের উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ খাতের নতুন সম্ভাবনা
বিশাল আকারের এআই মডেলগুলো পরিচালনার জন্য মেটার প্রতিটি ডেটা সেন্টারে ১ গিগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ সক্ষমতার প্রয়োজন হচ্ছে। মেটা বর্তমানে এরকম চারটি বিশাল ‘সুপারক্লাস্টার’ তৈরির কাজ করছে, যা ২০২৬ সালের মধ্যে তাদের সামগ্রিক অবকাঠামোগত ক্ষমতাকে দ্বিগুণে নিয়ে যাবে। এই বিশাল কম্পিউটিং সক্ষমতা মূলত মেটার এন্টারপ্রাইজ গ্রাহক এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের রিয়েল-টাইম এআই জেনারেশন টাস্ক দ্রুত সম্পন্ন করতে সাহায্য করবে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে শুধুমাত্র এআই অবকাঠামো এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণ খাতেই ৭.৬ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে। মেটা সেই আসন্ন বৈশ্বিক জোয়ারের একদম শুরুতেই নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিল। সাধারণ প্রযুক্তি প্রেমী থেকে শুরু করে বড় কর্পোরেট বিনিয়োগকারী—সবার চোখ এখন মেটার এই সাড়ে ৯ হাজার কোটি ডলারের মহাপ্রকল্পের বাস্তবায়নের দিকে।