প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান, বড় পরিকল্পনা সরকারের
মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় পরিকল্পিত নগরায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার পাশাপাশি নাগরিক সেবা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নগর ও বসতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই করে গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
মূল বিষয়গুলো
- দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
- নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশসম্মত আবাসন নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
- নিম্ন আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসীদের আবাসন সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
- পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সেবা ও পরিবেশ সুরক্ষাকে নগর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
পরিকল্পিত নগরায়নে সরকারের বড় উদ্যোগ
দেশে দ্রুত নগরায়ন হচ্ছে। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে শহর ও নগরের পরিধিও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু এই সম্প্রসারণ অনেক ক্ষেত্রেই পরিকল্পনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হচ্ছে না। ফলে যানজট, দূষণ, অপর্যাপ্ত নাগরিক সেবা, আবাসন সংকট এবং জলবায়ুজনিত অভিবাসনের মতো সমস্যা ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতায় প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের সিদ্ধান্তকে দীর্ঘমেয়াদি নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পরিকল্পিত নগরায়নের মাধ্যমে নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও বসবাসযোগ্য নগর গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
মাস্টারপ্ল্যানে থাকবে আবাসন ও নাগরিক সেবা
সরকারের পরিকল্পনায় শুধু রাস্তা, ভবন বা অবকাঠামো নির্মাণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। আবাসন, পানি, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ এবং নাগরিক সুবিধাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
‘সবার জন্য বাসস্থান’কে কেবল একটি ঘরের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখছে না সরকার। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা পাওয়ার সুযোগকেও এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পেতে পারে।
নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসনে বিশেষ গুরুত্ব
দ্রুত নগরায়নের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। শহরে কাজের সুযোগের আশায় আসা অনেক মানুষ পর্যাপ্ত ও নিরাপদ আবাসন না পেয়ে বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাস করেন। এতে আবাসন সংকটের পাশাপাশি পানি, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও চাপ তৈরি হয়।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, নিম্ন আয়ের পরিবার ও বস্তিবাসীদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিনের আবাসন সমস্যার সমাধানে মালিকানা অর্জনের সুযোগ তৈরি এবং বস্তি উন্নয়নের বিষয়ও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
কয়েকটি শহরে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ
পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে কয়েকটি শহরে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের মাধ্যমে সুষম নগর উন্নয়নের কাঠামো আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
এর ফলে এসব শহরের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ, ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামো এবং নাগরিক সুবিধা আরও সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে শহরের বিকাশ যেন বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের ওপর নির্ভর না করে একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোর মধ্যে এগোয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বিবেচনায়
বাংলাদেশের নগরায়নের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, লবণাক্ততা কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক মানুষ শহরমুখী হচ্ছেন। এতে নগরগুলোর ওপর বাড়তি জনসংখ্যার চাপ তৈরি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের নগরকে শুধু বড় করলেই হবে না, দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সামলানোর সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে। সরকারের ঘোষণায় তাই জলবায়ু-সহনশীল ও টেকসই নগর গড়ে তোলার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়
টেকসই নগরায়ন বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, এনজিও, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশেষ করে আবাসন, বস্তি উন্নয়ন, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কার্যকর হতে পারে। নগর উন্নয়নের সুফল যেন শুধু নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের নগর কেমন হবে
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের শহরগুলোর উন্নয়ন আরও পরিকল্পিত কাঠামোর মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কোথায় আবাসিক এলাকা হবে, কোথায় বাণিজ্যিক বা শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে, কোথায় নাগরিক সুবিধা বাড়াতে হবে—এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভিত্তি তৈরি হবে।
একই সঙ্গে সড়ক, পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্যানিটেশন, সবুজ এলাকা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব হবে। এর ফলে নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে নাগরিক জীবনের মানও উন্নত করার পথ তৈরি হতে পারে।
পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। পরিকল্পনা প্রণয়নের পর সেটি নিয়মিত অনুসরণ, প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামো নির্মাণ ও নাগরিক সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা প্রয়োজন। তা না হলে ভালো পরিকল্পনাও কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো—শহরকে শুধু ইট-পাথরের অবকাঠামো হিসেবে নয়, মানুষের বসবাসের জায়গা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নিরাপদ আবাসন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নাগরিক সুবিধা এবং সুষম উন্নয়নকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় প্রধানমন্ত্রী এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় জানিয়েছেন, যেখানে শহর ও গ্রাম নির্বিশেষে মানুষ নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন, প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা এবং সুস্থ পরিবেশে বসবাসের সুযোগ পাবে। পরিকল্পিত ও সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে মানবিক, বাসযোগ্য ও টেকসই বাংলাদেশ গড়াই সরকারের লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।





