তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে উচ্চকক্ষ ও স্পিকারকে নিয়ে নতুন প্রস্তাব: বিচার বিভাগকে বাইরে রাখার নতুন আইডিয়া
দেশের আগামী দিনের নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রক্রিয়া কেমন হবে, তা নিয়ে এক যুগান্তকারী ও নতুন প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প প্রস্তাব সামনে এসেছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর ২০২৬) জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এই চাঞ্চল্যকর ধারণার কথা জানানো হয়। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, আইনের অধ্যাপক ও দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর এই নতুন আইডিয়াটি উঠে আসে, যা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
নতুন প্রস্তাবের মূল হাইলাইটস:
• বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ বাইরে রেখে রাজনৈতিক আলোচনার ভিত্তিতে নতুন নির্বাচনকালীন কাঠামোর প্রস্তাব।
• দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ হলে বিলুপ্ত না হওয়া ‘উচ্চকক্ষ’ থেকে উপদেষ্টা নিয়োগের নতুন ভাবনা।
• সরকারি ও বিরোধী দলের সর্বসম্মত সম্মতিতে নির্বাচিত স্পিকারকে সরকারপ্রধান করার জোরালো আইডিয়া।
• সংবিধানে ‘উপরাষ্ট্রপতি’ বা ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট’ পদ সৃষ্টি করে তাঁকে উচ্চকক্ষের প্রধান করার নতুন প্রস্তাব।
উচ্চকক্ষের স্থায়ী কাঠামো ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন
সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৈঠক শেষে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই নতুন ধারণার বিশদ রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি জানান, যদি বাংলাদেশে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করা হয় এবং উচ্চকক্ষ যদি সাধারণ সংসদের মতো নির্দিষ্ট মেয়াদে একসাথে বিলুপ্ত না হয়, তবে সেই স্থায়ী কাঠামোকে কেন্দ্র করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার একটি আইনি পথ তৈরি হতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, উচ্চকক্ষ বহাল থাকলে তার মধ্য থেকেই নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী বা কেয়ারটেকার সরকার পরিচালনা করা সম্ভব। এই ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা কিংবা অন্যান্য উপদেষ্টাদের নির্বাচন করার প্রক্রিয়াটি হবে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক এবং গণতান্ত্রিক। এর ফলে অতীতের মতো বিচার বিভাগের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে না এবং সর্বোচ্চ আদালতের নিরপেক্ষতাও কোনো প্রশ্নের মুখে পড়বে না।
প্রধান হিসেবে স্পিকার অথবা ভাইস প্রেসিডেন্টের নাম আলোচনায়
এই নতুন প্রস্তাবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে জাতীয় সংসদের স্পিকারের নাম আলোচনা করা। কমিটির সভায় বিশিষ্টজনেরা মত দিয়েছেন যে, যদি দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল অর্থাৎ সরকারি দল এবং প্রধান বিরোধী দলের সম্পূর্ণ সম্মতিতে একজন স্পিকার নির্বাচিত হন, তবে নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে তাকেই নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
এছাড়া সংবিধানে নতুন করে ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট’ বা উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করার একটি প্রস্তাবও উত্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই উপরাষ্ট্রপতি পদাধিকারবলে সংসদের উচ্চকক্ষের স্পিকার বা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর নির্বাচন পরিচালনার জন্য এই ভাইস প্রেসিডেন্টকেই অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের মূল দায়িত্ব অর্পণ করার একটি বিকল্প ধারণাও টেবিলে রাখা হয়েছে।
লিখিত মতামত আহ্বান ও চূড়ান্ত রিপোর্টের প্রস্তুতি
কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেছেন যে, এগুলো এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং আইন বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের কাছ থেকে আসা বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাবের অংশ মাত্র। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে যে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক রয়েছে, তার একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করতেই এই চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
কমিটির পক্ষ থেকে দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রক্রিয়া ও এর সুনির্দিষ্ট এক্তিয়ার সম্পর্কে আগামী দিনগুলোতে লিখিত বক্তব্য ও সুনির্দিষ্ট আইনি প্রস্তাব জমা দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রাপ্ত সমস্ত লিখিত এবং মৌখিক প্রস্তাবনাগুলো সুসংহত করে কমিটি একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি করবে, যা পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে বিল আকারে পেশ করা হতে পারে।




