জাতীয় ফিচার শীর্ষ এক

মেধা থাকলেও মেলেনি চাকরি: ৩ বিসিএসে বঞ্চিতদের কান্নার রোল

বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের (ডিএসবি) অজুহাতে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) কর্তৃক চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্রীয় নিয়োগ থেকে বঞ্চিত রয়েছেন শত শত মেধাবী তরুণ। এই চরম বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির দাবিতে এবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) একটি বিশেষ ও আবেগঘন সংবাদ সম্মেলন করেছেন ৩ বিসিএসে গেজেটবঞ্চিতদের নিয়োগ প্রত্যাশী কেন্দ্রীয় কমিটি। দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পাস করার পরও শুধু রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের কারণে তাদের জীবন থেকে মূল্যবান সময় হারিয়ে গেছে। নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয় নেওয়া বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কাছে তারা অনতিবিলম্বে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
মূল হাইলাইটস
    • ২৮তম, ৩৭তম এবং ৩৯তমসহ কয়েকটি বিসিএসে পিএসসি কর্তৃক চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েও ১০৪ জন প্রার্থী দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে গেজেটবঞ্চিত।
    • কোনো প্রকার সুনির্দিষ্ট অপরাধ বা মামলা ছাড়াই কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক গোয়েন্দা প্রতিবেদনের (VVR) ভিত্তিতে নিয়োগ স্থগিতের অভিযোগ।
    • জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং নতুন পিএসসি প্রশাসনের প্রতি বৈষম্য দূর করে অতি দ্রুত গ্যাজেট প্রকাশের মাধ্যমে নিয়োগ প্রদানের দাবি।
    • আইনি লড়াইয়ে উচ্চ আদালত থেকে নিজেদের পক্ষে রায় পাওয়ার পরও দীর্ঘ প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের জটিলতায় আটকে আছে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন।

মেধার অবমূল্যায়ন ও কয়েক বছরের দীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক যাতনা
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করার সময় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ প্রার্থীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা জানান, পিএসসির সব পরীক্ষায় মেধার স্বাক্ষর রেখে কাস্টমস, পররাষ্ট্র, প্রশাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তারা। অথচ তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের আশীর্বাদ না থাকায় কিংবা দূরসম্পর্কের কোনো আত্মীয়ের ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকার কারণে ডিএসবি রিপোর্টে তাদের ‘অযোগ্য’ বলে চিহ্নিত করা হয়। এর ফলে গেজেট প্রকাশের সময় তাদের নামগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দিয়ে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছিল। এটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারের ওপর এক চরম ও নগ্ন হস্তক্ষেপ।
ভুক্তভোগীদের একাংশের পক্ষে ডা. মো. নুরুজ্জামান জানান, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তারা কেবল বেকারত্বের অভিশাপই বইছেন না, বরং সমাজে অপরাধীর মতো জীবনযাপন করছেন। তাদের অনেক সহপাঠী আজ পদোন্নতি পেয়ে সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হয়ে গেছেন, অথচ তারা নিজেদের মেধার অধিকার ফিরে পেতে আজ প্রেস ক্লাবের টেবিলে মাথা ঠুকছেন। এই দীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক যাতনা তাদের পুরো পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। রাষ্ট্র যখন প্রতিটি সেক্টরে ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করে বৈষম্য দূর করছে, তখন তাদের এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কান্না কেন প্রশাসনের কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না, সেই প্রশ্ন তোলেন তারা।
আদালতের রায় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের স্থবিরতা
আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভুক্তভোগী প্রার্থীদের অনেকেই সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন। বিজ্ঞ আদালত সমস্ত নথিপত্র এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে প্রার্থীদের পক্ষে স্পষ্ট রায় প্রদান করেন। উচ্চ আদালত থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন অনতিবিলম্বে এই মেধা তালিকায় থাকা প্রার্থীরা যেন ক্যাডার সার্ভিসে যোগদানের সুযোগ পান। অথচ বিগত কয়েক মাস ধরে ফাইলগুলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে রহস্যজনক প্রশাসনিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে আটকা পড়ে আছে।
এই চরম আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির কারণে ৩ বিসিএসে গেজেটবঞ্চিতদের নিয়োগ প্রক্রিয়াটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। সংবাদ সম্মেলন থেকে প্রার্থীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তারা কোনো দল বা গোষ্ঠীর হয়ে কথা বলছেন না। তারা কেবল নিজেদের সৎ উপার্জনের অধিকার এবং রাষ্ট্রকে সেবা করার সুযোগ চান। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রধান নির্বাহী এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই জটিলতা নিরসন হওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
নতুন পিএসসি চেয়ারম্যান ও সংস্কারের নতুন হাওয়া
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) নতুন চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। নতুন কমিশন মেধার সঠিক মূল্যায়ন এবং অতীতের সমস্ত নিয়োগ কেলেঙ্কারির তদন্ত করার যে অঙ্গীকার করেছে, তার সাথে এই বঞ্চিত প্রার্থীদের বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। ওলামা সমাজ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরাও মনে করছেন, যোগ্য মানুষকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা ইসলামের অন্যতম বড় অবমাননা।
প্রজ্ঞাপন জারির আলটিমেটাম ও পরবর্তী কঠোর কর্মসূচি
সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে প্রার্থীরা সরকারকে আগামী ৭ কার্যদিবসের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা আলটিমেটাম বেঁধে দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে যদি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে তাদের নিয়োগের চূড়ান্ত গেজেট বা প্রজ্ঞাপন জারি করা না হয়, তবে তারা শাহবাগে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে আমরণ অনশনের মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবেন। রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষ আশা করে, সরকার অতি দ্রুত এই তরুণ সমাজকে তাদের যোগ্য আসনে বসিয়ে দেশের মেধা পাচার রোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।

মাসুম

About Author

I am a sarvent of Allah. I follow mohammad (sm) only. "La ilaha Illallahu Muhammadur rasulullah"

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র