ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর এক নজিরবিহীন মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে রাজবাড়ী পৌরসভা মিলনায়তনে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে তিনি এই মন্তব্য করেন। উপদেষ্টা স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছেন যে, বাংলাদেশ বর্তমানে এক কঠিন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে এবং পূর্ববর্তী আমলের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর শাসন ব্যবস্থার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির নাগরিকদের। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, বিদ্যমান মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপে দেশে ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে。
এক নজরে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকটের চিত্র:
- উত্তরাধিকারের সংকট: পূর্ববর্তী প্রশাসনের পলিসিগত ভুলের কারণে উত্তরাধিকার সূত্রে একটি সম্পূর্ণ ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে বর্তমান সরকার।
- দারিদ্র্যের গ্রাফ: দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে নতুন করে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবদমিত।
- বিনিয়োগে ধস: বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় যুব ও শিক্ষিত সমাজের কর্মসংস্থানের সংকট প্রকট।
- বাহ্যিক ধাক্কা: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান তীব্র সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
মূল্যস্ফীতির গ্রাফ ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার সংকট
রাজবাড়ীর মতবিনিময় সভায় অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর দেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের যন্ত্রণার কথা গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলেন। তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকা নিত্যপণ্যের দামের কারণে সাধারণ পরিবারের আয়ের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে চাল, ডাল ও তেল কিনতে। এই দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ তাদের সঞ্চয় হারিয়ে ফেলছে এবং খাদ্য তালিকা থেকে পুষ্টির পরিমাণ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় শিক্ষিত তরুণরা চরম হতাশায় ভুগছে। উপদেষ্টা মনে করেন, যতক্ষণ না অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজার সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই চাপ প্রশমন করা বেশ কঠিন। তবে সরকার বাজার স্থিতিশীল করতে এবং কৃত্রিম সংকটকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে মাঠ প্রশাসনকে কড়া নির্দেশ দিয়েছে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার
দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আর্থিক সংস্থার প্রক্ষেপণ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সমসাময়িক আলোচনা নিয়ে কথা বলেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় দেশের জিডিপি নিয়ে তথ্য বিকৃত করে এক ধরণের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে যে পূর্বাভাস দিয়েছে, সেখানে একটি মৌলিক বিষয় সম্পূর্ণ উপেক্ষিত রয়ে গেছে। উপদেষ্টা স্পষ্ট করে বলেন, “আইএমএফ যে হিসাব কষেছে, সেখানে কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি। আমরা যদি ব্যাংকিং খাত এবং রাজস্ব আহরণে বড় ধরণের সংস্কার প্রক্রিয়া সফল করতে না পারি, তবে প্রবৃদ্ধির হার আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।”
ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও সামাজিক সুরক্ষার ঢাল
অর্থনীতিকে এই গভীর খাদ থেকে টেনে তুলতে বর্তমান সরকার মূলত দুটি প্রধান জায়গায় হাত দিয়েছে। প্রথমটি হলো খেলাপি ঋণের বৃত্তে আটকে থাকা ব্যাংকিং খাতে কড়া শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দ্বিতীয়টি হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) মাধ্যমে কর আহরণের পরিধি বহুগুণ বাড়ানো। এই দুটি স্তম্ভ সোজা করতে পারলে ঋণের ওপর দেশের নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
একই সঙ্গে দেশের এই ভঙ্গুর অর্থনীতির বাজারে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে বাঁচাতে সরকার বেশ কিছু যুগান্তকারী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের জন্য বিশেষ কৃষি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি ভর্তুকি মূল্যে খাদ্য ও সার বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার ফলে মানুষের জীবনে দ্রুত কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে আসবে বলে বিশ্বাস সরকারের।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপরেখা
কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক এই সংকটের মুখে দেশের দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার জন্য জ্বালানি নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অতীতে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতের মতো টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিশাল সুযোগ থাকলেও তার সঠিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি।
বর্তমান প্রশাসন এখন পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী বিকল্প জ্বালানি খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগ দিচ্ছে। মতবিনিময় সভায় রাজবাড়ী জেলা পরিষদের প্রশাসক আব্দুস সালাম ও জেলা তথ্য কর্মকর্তা রেখা ইসলামসহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন, যারা মাঠ পর্যায়ের এই সরাসরি আলোচনার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান।