ডিগ্রি আছে চাকরি নেই: ৬০ শতাংশ শিক্ষিত তরুণ বাধ্য হচ্ছেন অন্য পেশায়
স্নাতক ডিগ্রিধারীদের চাকরি
পাওয়ার চিরাচরিত স্বপ্ন এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বছরের পর বছর হাড়ভাঙা খাটুনি আর লাখ লাখ টাকা খরচ করে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান মিলছে না অধিকাংশ তরুণের। সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক বিস্ফোরক তথ্য। সেখানে দেখা গেছে, পাস করার পর প্রায় ৬০ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত যুবক তাদের পড়াশোনার বিষয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ অমিল রয়েছে এমন সব পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।
একনজরে মূল তথ্যসমূহ
• উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ৬০ শতাংশই নিজেদের মূল বিষয়ের বাইরে গিয়ে সাধারণ বা অন্য কোনো কাজ করছেন।
• প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে বর্তমান কর্মবাজারের চাহিদার মধ্যে তৈরি হয়েছে এক বিশাল অমিল ও দূরত্ব।
• উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে লাখ লাখ যুবকের মেধার অপচয় হচ্ছে এবং বাড়ছে তীব্র হতাশা।
• বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন না করলে এই সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
ক্যারিয়ারের স্বপ্ন ও রূঢ় বাস্তবতার সংঘাত
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জীবন শেষ করে প্রতিটি তরুণই স্বপ্ন দেখেন নিজের পছন্দের বিষয়ে একটি সম্মানজনক ক্যারিয়ার গড়ার। কিন্তু ক্যাম্পাস থেকে বের হতেই বাস্তবতার কঠিন দেয়াল তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। হাজার হাজার পদের বিপরীতে লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীর প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে একসময় দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তাদের। জীবনধারণের তাগিদে বাধ্য হয়েই তখন যেকোনো ধরনের কাজে যোগ দিতে হচ্ছে উচ্চশিক্ষিত এই তরুণদের।
অনেকেই বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় যে তাত্ত্বিক জ্ঞান দেওয়া হয়, তা বর্তমান করপোরেট বা আধুনিক শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ডিগ্রি থাকলেও দক্ষতার অভাবে নিয়োগকর্তারা ফ্রেশারদের নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর।
স্নাতক ডিগ্রিধারীদের চাকরি ও বিশ্ববাজারের প্রবণতা
এই সমস্যাটি কেবল নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বৈশ্বিক সংকট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বৈশ্বিক শ্রমবাজারের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রযুক্তি এবং দক্ষতার চাহিদা প্রতিদিন পরিবর্তিত হচ্ছে। অথচ আমাদের প্রচলিত শিক্ষাক্রম বছরের পর বছর ধরে একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে।
উন্নত দেশগুলোতেও এখন ডিগ্রির চেয়ে প্র্যাকটিক্যাল স্কিল বা প্রায়োগিক দক্ষতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ফলে যারা শুধু সনাতন পদ্ধতির সার্টিফিকেট নিয়ে বের হচ্ছেন, তারা তীব্র প্রতিযোগিতায় ছিটকে পড়ছেন। এই কারণে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের চাকরি পাওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে এবং তারা কম বেতনের সাধারণ কাজে আত্মনিয়োগ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
মেধার অপচয় ও তরুণ সমাজের মানসিক চাপ
পড়াশোনা শেষ করে যখন একজন তরুণ যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পান না, তখন তার মধ্যে তীব্র হতাশা এবং মানসিক অবসাদ দানা বাঁধে। পরিবারের প্রত্যাশার চাপ এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের আত্মবিশ্বাসকে পুরোপুরি ভেঙে চুরমার করে দেয়। একজন ইঞ্জিনিয়ার যখন রাইড শেয়ারিং করেন কিংবা একজন বিজ্ঞানের স্নাতক যখন সাধারণ দোকানে সেলসসম্যানের কাজ করেন, তখন সেটি কেবল তার ব্যক্তিগত পরাজয় নয়, বরং পুরো সমাজ ব্যবস্থার একটি বড় ব্যর্থতা।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, মেধার এই ধরনের অপচয় চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে দেশ এক বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতার মুখোমুখি হবে। যে তরুণদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ হিসেবে ব্যবহার করার কথা ছিল, তারা উল্টো এক বড় বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
সংকট উত্তরণে কোন পথে হাঁটতে হবে?
এই অন্ধকার পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার পথ কিন্তু একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং যুগোপযোগী সংস্কার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল সার্টিফিকেট বিতরণের কারখানা না বানিয়ে, বাজারমুখী ও দক্ষতাকেন্দ্রীক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি মজবুত সমন্বয় বা ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ’ তৈরি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। পড়াশোনার পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ, বাস্তবমুখী প্রজেক্ট এবং কারিগরি জ্ঞানকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করার জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারি নীতিসহায়তা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, যাতে তরুণরা কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।





