দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামের মধ্যে এক কেজি গরু ও ছাগলের মাংস উৎপাদন খরচ কত এবং খুচরা বাজারের সাথে এর ব্যবধান ঠিক কোথায়, তা আনুষ্ঠানিকভাবে খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বৈঠকে দেশের বাজারে মাছ, গরুর মাংস, খাসির মাংস, ডিম ও দুধের উৎপাদন খরচের তুলনায় খুচরা বাজারে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
মূল ঘটনা সংক্ষেপে:
-
- উৎপাদন পর্যায়ে প্রকৃত খরচের চেয়ে খুচরা বাজারে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে গরু ও ছাগলের মাংস।
- খামারিরা সরাসরি বাজারে পণ্য বিক্রি করতে না পারায় মধ্যস্বত্বভোগীরা অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে।
- একদিনের মুরগির বাচ্চা, ডিম এবং পশুখাদ্যের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে মন্ত্রণালয় একটি নতুন কৌশলপত্র তৈরি করেছে।
- অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ও কৃত্রিম সংকট রোধে দেশব্যাপী বাজারভিত্তিক কঠোর তদন্ত ও তদারকি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উৎপাদন ও খুচরা বাজারের বিশাল ব্যবধান
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত উৎপাদন খরচের তুলনায় খুচরা বাজারে ভোক্তাদের কাছ থেকে দ্বিগুণেরও বেশি দাম রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে খামারি পর্যায়ে গরুর মাংস ও ছাগলের মাংস উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, সাধারণ ভোক্তাদের তা কিনতে হচ্ছে চড়া মূল্যে। একইভাবে বাজারে এক লিটার দুধের উৎপাদন খরচ মাত্র ৪৪ টাকা ৮০ পয়সা হলেও সাধারণ ভোক্তাদের তা কিনতে হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকায়। এই পরিস্থিতি সাধারণ ক্রেতাদের আমিষের চাহিদা পূরণে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খামারিদের সংকট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য
বৈঠকের আলোচনায় উঠে আসে যে, দেশের প্রান্তিক খামারিরা দিনরাত পরিশ্রম করেও তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। ছাগল ও গরু পালনে পশুখাদ্যের পেছনে যে পরিমাণ ব্যয় হয়, সেই অনুপাতে বিক্রির সময় ন্যায্য লাভ পান না উৎপাদকরা। এর প্রধান কারণ হলো, খামারিরা সরাসরি খুচরা বাজারে তাদের পণ্য বিক্রি করার সুযোগ পান না। বিভিন্ন স্তরে কয়েক হাত বদল হয়ে যখন এই মাংস বা দুধ ভোক্তার কাছে পৌঁছায়, তখন মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত মুনাফার কারণে দাম অনেক বেড়ে যায়। ফলে একদিকে সাধারণ ক্রেতারা ঠকছেন, অন্যদিকে আসল উৎপাদকরা লোকসানের মুখে পড়ছেন।
কঠোর বাজার তদারকির সুপারিশ সংসদীয় কমিটির
এই অযৌক্তিক মূল্যের ব্যবধান কমিয়ে আনতে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় যেকোনো ধরনের অনিয়ম বন্ধ করতে কঠোর সুপারিশ করেছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কমিটির সভাপতি খায়রুল কবির খোকনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বাজারভিত্তিক নিয়মিত তদন্ত পরিচালনার ওপর জোর দেওয়া হয়। বৈঠকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ এবং প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু উপস্থিত ছিলেন। তারা প্রত্যেকেই একমত হয়েছেন যে, ভোক্তা অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা অত্যন্ত জরুরি।
টেকসই সমাধান ও খামারিদের জন্য বিশেষ সহায়তা
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুধু বাজার তদারকিই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে খামারিদের সরাসরি সহায়তা বাড়ানো হবে। গো-খাদ্য ও ছাগলের জন্য বিশেষায়িত ফিডের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং খামারিদের আধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ করার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের পশুপালন খাতে মাংস উৎপাদন খরচ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। একই সাথে তৃণমূল পর্যায় থেকে সরাসরি বাজারে পণ্য সরবরাহের একটি নিরাপদ চেইন বা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যাপারেও কাজ চলছে।
জাতীয় প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে গবাদি পশু ও পোল্ট্রি খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। সরকার যদি সঠিক সময়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং খামারিদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়, তবেই বাজারে সব ধরনের মাংসের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে।