বিদ্যুৎ বিপর্যয় এর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর, ২০২৬) দুপুরে মেঘনাঘাট-হরিপুর সঞ্চালন লাইনে আকস্মিক কারিগরি ত্রুটির কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামের একটি বড় অংশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। এই ঘটনার পর রাতে পিজিসিবির এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে ৫ সদস্যের এই কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়। সঞ্চালন-২ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সৈয়দ এবাদুল্লাহ হায়দার আলীকে এই তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে এবং আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পিজিসিবির তদন্ত কমিটির মূল ফ্যাক্টস:
- কমিটির নেতৃত্ব: সঞ্চালন-২ এর প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ এবাদুল্লাহ হায়দার আলীর নেতৃত্বে ৫ সদস্যের প্যানেল।
- তদন্তের সময়সীমা: আগামী ৫ কর্মদিবসের মধ্যে গ্রিড ট্রিপ করার মূল কারিগরি কারণসহ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ।
- প্রভাবিত অঞ্চল: ঢাকার পূর্বাঞ্চল (গুলশান, মতিঝিল, রামপুরা, সিদ্ধিরগঞ্জ) এবং চট্টগ্রামের বিশাল এলাকা।
- ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ: মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৫,৩৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
আকস্মিক গ্রিড ট্রিপ ও জনজীবনের ভোগান্তি
মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ৪৩ মিনিটে আকস্মিক এক যান্ত্রিক ত্রুটি পুরো বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাকে বড় ধাক্কা দেয়। মেঘনাঘাট-হরিপুর জাতীয় গ্রিড লাইনে ত্রুটি দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই চট্টগ্রামের একাধিক সঞ্চালন লাইন একের পর এক ট্রিপ করতে শুরু করে। ফলে মুহূর্তের মধ্যেই রাজধানীর সচিবালয়, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টসহ গুলশান, মতিঝিল, রামপুরা ও সিদ্ধিরগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। হঠাৎ এই ব্ল্যাকআউটের কারণে অফিস-আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
পাওয়ার গ্রিডের প্রকৌশলীরা সঙ্গে সঙ্গেই ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) নিয়ন্ত্রণে থেকে ধাপে ধাপে সিস্টেম পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ প্রায় দুই ঘণ্টার নিরলস প্রচেষ্টায় দুপুর আড়াইটার দিকে গ্রিডের মূল লাইন ও উপকেন্দ্রগুলো সচল করা সম্ভব হয়। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যায়ক্রমে চালু করতে হওয়ায় উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে রাত পর্যন্ত সময় লেগে যায়, যার ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত লোডশেডিং পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তদন্ত কমিটির কার্যপরিধি ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি জানিয়েছে, এই তদন্ত কমিটির মূল কাজ হবে ঠিক কোন টেকনিক্যাল ফাল্টের কারণে গ্রিড লাইনটি ডাউন হয়েছিল তা খুঁজে বের করা। একই সঙ্গে সঞ্চালন লাইনের সুরক্ষাব্যবস্থা বা রিলে ট্রিপিং সঠিক সময়ে কাজ করেছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখবেন বিশেষজ্ঞরা। কারিগরি ত্রুটির পাশাপাশি বিতরণ সংস্থাগুলোর কোনো গাফিলতি বা লোড শেডিং নির্দেশনার অমান্য করার মতো বিষয় ছিল কি না, তা-ও তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের বড় মাপের বিদ্যুৎ বিপর্যয় আর না ঘটে, সেজন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী আধুনিক ও টেকসই গ্রিড প্রটেকশন ব্যবস্থার সুপারিশ করবে এই কমিটি। সরকারি এই সংস্থাটি অনাকাঙ্ক্ষিত এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জনসাধারণের সাময়িক অসুবিধার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে।
অতীতে জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের ইতিহাস
বাংলাদেশে জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের বিপর্যয় এটাই প্রথম নয়। এর আগে ২০২২ সালের ৪ অক্টোবর পূর্বাঞ্চলীয় গ্রিডে এক বড় ধরনের ট্রিপের কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহসহ দেশের প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকা দীর্ঘ ৭-৮ ঘণ্টা সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন ছিল। তারও আগে ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর ভারতের সঙ্গে সঞ্চালন লাইনে ত্রুটির কারণে প্রায় ১২ ঘণ্টার জন্য পুরো দেশ ব্ল্যাকআউটের কবলে পড়েছিল।
বারবার এই ধরনের সঞ্চালন লাইনের ত্রুটি আমাদের জ্বালানি খাতের দুর্বল অবকাঠামোকে সামনে নিয়ে আসে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রিপিং সিস্টেমকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং আধুনিকায়ন না করা পর্যন্ত এই ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা থেকেই যায়। এবারের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনটি তাই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।