জাতীয় ফিচার শীর্ষ এক স্বাস্থ্য

ভ্যাকসিন কারখানা স্থাপনে সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: টোকিওতে মেগা বৈঠক

জাপানের টোকিওতে নৈশভোজে অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও নিপ্পন ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিদল
ভ্যাকসিন কারখানা স্থাপনে সহযোগিতা চেয়ে জাপানের অন্যতম শীর্ষ দাতব্য প্রতিষ্ঠান নিপ্পন ফাউন্ডেশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (২৬ অক্টোবর, ২০২৬) জাপানের রাজধানী টোকিওর মেইজি কিনেনকানের ঐতিহাসিক হানাগাসুমি রেস্তোরাঁয় নিপ্পন ফাউন্ডেশনের অনারারি চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার আমন্ত্রণে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের নৈশভোজে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেন তিনি। সরকারি সফরে জাপানে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন এবং বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতের টেকসই রূপান্তরের অংশ হিসেবে এই মেগা প্রকল্পের রূপরেখা তুলে ধরেন। সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও জীবনরক্ষাকারী প্রতিষেধক উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যেই মূলত এই বৈশ্বিক অংশীদারত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
একনজরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মূল তথ্যসমূহ
    • গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা: বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে উন্নত ভ্যাকসিন উৎপাদনের অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং কৌশলগত বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ।
    • কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: বাংলাদেশের শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তা খাতে নিপ্পন ফাউন্ডেশনের দীর্ঘদিনের অবদানের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন।
    • পূর্ববর্তী ধারাবাহিকতা: গত সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় ইয়োহেই সাসাকাওয়ার সাথে প্রধানমন্ত্রীর ফলপ্রসূ বৈঠকের ধারাবাহিকতায় এই আলোচনা গতি পায়।
    • উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতি: বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নীতি-নির্ধারক মন্ত্রীগণ এবং জাপানের পক্ষে নিপ্পন ফাউন্ডেশনের শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


টোকিওতে জনস্বাস্থ্য খাতের মেগা প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা
টোকিওর ওই বিশেষ নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, মহামারি ও বিভিন্ন মারাত্মক সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সবসময় উন্নত দেশের আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এই নির্ভরতা কমিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য নিপ্পন ফাউন্ডেশনের মতো অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, যেখানে ওষুধ শিল্পে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। এই ওষুধ শিল্পের দক্ষ মানবসম্পদ ও অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে ভ্যাকসিন তৈরিতে জাপানের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হলে তা দেশের জন্য গেম-চেঞ্জার হবে। বিশেষ করে শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টিকাদান কর্মসূচিকে শতভাগ নিরাপদ ও সাশ্রয়ী করতে দেশেই উৎপাদন ইউনিট চালু করা দরকার।
সেপ্টেম্বরের ঢাকা বৈঠকের পর টোকিওতে নতুন গতি
বৈঠক চলাকালে প্রধানমন্ত্রী গত সেপ্টেম্বরে ঢাকায় নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার সঙ্গে অনুষ্ঠিত সৌজন্য সাক্ষাতের চমৎকার স্মৃতি ও ফলপ্রসূ পর্যালোচনার কথা স্মরণ করেন। সে সময় ঢাকায় যে সব দ্বিপাক্ষিক সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়েছিল, টোকিওর এই ফলো-আপ মিটিংয়ে সেগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
ভ্যাকসিন কারখানা স্থাপনে সহযোগিতা পাওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ মূলত বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটে নিজস্ব প্রস্তুতি শক্তিশালী করতে চায়। নিপ্পন ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরেই কুষ্ঠ রোগ নির্মূলসহ জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন বড় প্রকল্পে বিশ্বজুড়ে কাজ করছে। তাদের এই বিশাল আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের মাটিতে কাজে লাগিয়ে একটি আধুনিক বায়ো-টেকনোলজি হাব প্রতিষ্ঠা করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে বর্তমান সরকারের।
উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ ও কূটনৈতিক গুরুত্ব
এই মেগা প্রজেক্টের গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও উপদেষ্টা এই নৈশভোজে অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এই সময় উপস্থিত ছিলেন।
জাপানের পক্ষে নিপ্পন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক তাকাশি আরিকাওয়াসহ সংস্থাটির অত্যন্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা টেবিলে বসেন। এই ধরনের সমন্বিত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কেবল সাধারণ সাহায্য-সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন বড় আকারের কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও জাপানি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন
নিপ্পন ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা বাংলাদেশের এই দূরদর্শী প্রস্তাবকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন। তারা জানান, বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তি ও সাম্প্রতিক বছরগুলোর প্রবৃদ্ধি বিশ্ব দরবারে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় একটি দেশের নিজস্ব ভ্যাকসিন উৎপাদন ক্ষমতা থাকা কতটা জরুরি, তা বিগত বৈশ্বিক মহামারিগুলো বিশ্বকে শিখিয়েছে।
বাংলাদেশ যদি জাপানের কারিগরি প্রযুক্তিগত সহায়তায় নিজস্ব প্ল্যান্ট স্থাপন করতে পারে, তবে তা শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাই মেটাবে না, বরং ভবিষ্যতে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশেও প্রতিষেধক রপ্তানির পথ সুগম করবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে খুব দ্রুতই একটি যৌথ টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে মাঠপর্যায়ের সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এর ফলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকবে।

মাসুম

About Author

I am a sarvent of Allah. I follow mohammad (sm) only. "La ilaha Illallahu Muhammadur rasulullah"

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র