সংসদের মেয়াদ ৪ বছর ও উচ্চকক্ষের ৬ বছর করার প্রস্তাব: সংবিধান সংস্কারে বড় পরিবর্তনের হাওয়া
দেশের বর্তমান সংসদীয় গণতান্ত্রিক কাঠামো ও শাসনব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক এবং সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের রূপরেখা সামনে এসেছে। জাতীয় সংসদের সংবিধান সংস্কার কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে জাতীয় সংসদের মেয়াদ বর্তমানের ৫ বছর থেকে কমিয়ে ৪ বছর করার একটি নীতিগত প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। একই সাথে দেশে প্রথমবারের মতো দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে গঠিতব্য উচ্চকক্ষের মেয়াদ ৬ বছর করার জন্য আইন বিশেষজ্ঞরা জোর সুপারিশ করেছেন। এই বৈপ্লবিক প্রস্তাবটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও বুদ্ধিজীবী মহলে ইতিমধ্যে ব্যাপক তোলপাড় ও চুলচেরা বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে।
সংসদীয় সংস্কারের মূল হাইলাইটস:
• বর্তমান এককক্ষ বিশিষ্ট জাতীয় সংসদের পরিবর্তে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠনের জোরালো সুপারিশ।
• সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নিম্নকক্ষ বা সাধারণ সংসদের মেয়াদ ৪ বছর করার প্রস্তাব।
• বিভিন্ন পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চকক্ষের মেয়াদ ৬ বছর করার নতুন রূপরেখা।
• ঘন ঘন নির্বাচন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য।
দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট কাঠামো ও সংসদের মেয়াদ পুনর্নির্ধারণ
সংবিধান সংস্কার কমিটির অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশের সামগ্রিক রাষ্ট্র কাঠামোতে ভারসাম্য আনার অংশ হিসেবেই এই নতুন সংসদীয় রূপরেখার কথা ভাবা হচ্ছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদের নিম্নকক্ষ বা বর্তমান জাতীয় সংসদ হবে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে। এই নিম্নকক্ষের মূল দায়িত্ব হবে আইন প্রণয়ন এবং সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
জনগণের প্রত্যাশার দ্রুত প্রতিফলন ঘটাতে এবং ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ রোধে এই নিম্নকক্ষ বা সাধারণ সংসদের মেয়াদ ৪ বছরে নামিয়ে আনার যুক্তি দেখিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন সেক্টরের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী এবং অভিজ্ঞ প্রবীণ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি উচ্চকক্ষ বা উচ্চ পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই উচ্চকক্ষের মেয়াদ হবে ৬ বছর, যার এক-তৃতীয়াংশ সদস্য প্রতি দুই বছর পর পর পর্যায়ক্রমে অবসরে যাবেন, যার ফলে মার্কিন সিনেটের মতো এটি একটি স্থায়ী কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।
রাজনৈতিক জবাবদিহিতা ও বিশেষজ্ঞদের চুলচেরা বিশ্লেষণ
এই যুগান্তকারী প্রস্তাবের পক্ষে সায় দিয়ে দেশের বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, ৫ বছরের মেয়াদ অনেক সময় সরকারকে জনগণের ম্যান্ডেট থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব তৈরি করে। ৪ বছর পর পর নিয়মিত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে যেকোনো নির্বাচিত সরকার জনগণের মুখোমুখি হতে বাধ্য থাকবে। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও এক ধরনের ইতিবাচক প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা তৈরি হবে।
তাছাড়া, ৬ বছরের মেয়াদে উচ্চকক্ষ গঠিত হলে তা একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদী পলিসি বা নীতি প্রণয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। কারণ সাধারণ রাজনৈতিক ডামাডোলের কারণে নিম্নকক্ষ ভেঙে গেলেও উচ্চকক্ষ বহাল থাকবে, যা রাষ্ট্রের আইনি ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে। তবে এই দ্বৈত ব্যবস্থার কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অতিরিক্ত ব্যয় এবং প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হবে কিনা, তা নিয়ে কিছু বিশেষজ্ঞ সংশয় প্রকাশ করেছেন।
চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়া ও পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ
সংবিধান সংস্কার কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই প্রস্তাবটি এখন প্রাথমিক খসড়া ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই বিষেয়ে সংলাপে বসবে সংস্কার কমিশন। রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত ও জনআকাঙ্ক্ষা বিবেচনা করে খসড়াটি চূড়ান্ত আইনি রূপ দেওয়া হবে।
পরবর্তীতে এই ঐতিহাসিক সংস্কার প্রস্তাবটি দেশের অধ্যাদেশ বা গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের এই সাহসী পদক্ষেপ যদি শেষ পর্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি হবে অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক মাইলফলক।





