বিদ্যুৎ খাতে স্বস্তির খবর: বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু করল বাংলাদেশ
দীর্ঘ দুই মাসেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর অবশেষে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি পুনরায় সফলভাবে চালু করতে পেরেছে বাংলাদেশ। গত আগস্ট মাসের ভয়াবহ বন্যা এবং প্রাণঘাতী ভূমিধসের কারণে হিমালয়কন্যার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফলে সাময়িকভাবে ঢাকার উদ্দেশ্যে নেপালি গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। তবে সমস্ত সংকট কাটিয়ে নতুন বিকল্প জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে ভারতের সঞ্চালন লাইন ব্যবহার করে গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যা থেকে আবারও বাংলাদেশে এই বিদ্যুৎ প্রবাহ সচল হয়েছে।
বিদ্যুৎ আমদানির সর্বশেষ আপডেট একনজরে:
• ত্রিপক্ষীয় ঐতিহাসিক চুক্তি অনুযায়ী নেপাল থেকে দৈনিক ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ।
• গত ২৬ আগস্ট ভোটেকোশি নদীর আকস্মিক বন্যায় আগের দুটি প্রধান জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
• বিকল্প হিসেবে সোলু খোলা ও কাবেলি বি-১ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল করা হয়েছে।
• ভারতের ৪০০ কেভি মুজফ্ফরপুর-বহরমপুর-ভেরামারা আন্তর্জাতিক সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আসছে।
বন্যার ধ্বংসযজ্ঞ পেরিয়ে বিকল্প গ্রিডে বিদ্যুৎ প্রবাহ
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (NEA) ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত ২৬ আগস্টের প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেশের পুরো জ্বালানি রফতানি খাতকে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছিল। বিশেষ করে পূর্ববর্তী চুক্তির আওতাধীন ত্রিশূলী এবং চিলিম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প দুটি বন্যার পানিতে প্রায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।
সেই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পাঠানোর জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (CEA) জরুরি ছাড়পত্রের প্রয়োজন ছিল। সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ভারতের গ্রিড ব্যবহারের বিশেষ অনুমতি মেলায় সোলু খোলা এবং কাবেলি বি-১ প্রকল্প থেকে সরাসরি ভেরামারা গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ হতে শুরু করেছে।
চুক্তি ও আর্থিক হিসাব: প্রান্তি ও সম্ভাবনা
২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর কাঠমান্ডুতে নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (NEA), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এবং ভারতের এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেডের (NVVN) মধ্যে এই ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছরের ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত বর্ষা ও শরৎ মৌসুমে নেপাল তার উদ্বৃত্ত জলবিদ্যুৎ বাংলাদেশে পাঠাবে।
বাংলাদেশ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য নেপালকে ৬.৪ ইউএস সেন্ট (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৮.১৭ টাকা) পরিশোধ করছে। তবে শীতের শুষ্ক মৌসুমে নেপালের নিজেদের নদীর পানি কমে যাওয়ায় তারা তখন বিদ্যুৎ পাঠাতে পারে না। তা সত্ত্বেও এই পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
দেশের জ্বালানি সংকটে কতটা স্বস্তি দেবে এই বিদ্যুৎ?
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক ও ডলার সংকটের বাজারে এই চুক্তি দেশের জ্বালানি খাতের জন্য অত্যন্ত সাশ্রয়ী। যদিও জাতীয় গ্রিডের তুলনায় মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সংখ্যায় অনেক কম মনে হতে পারে, তবুও এর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম।
এর মাধ্যমে ভারতের বাইরে তৃতীয় কোনো দেশ থেকে পাইপলাইনের মতো সরাসরি গ্রিডে বিদ্যুৎ আনার পথ উন্মোচিত হলো। ভবিষ্যতে নেপালের বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকে আরও ৫০০ থেকে ১০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ আমদানির আলোচনা ইতিমধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। বর্তমান লোডশেডিং পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী গ্রিন এনার্জি নিশ্চিত করতে নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।





