অন্যান্য ফিচার বিশ্ব সংযোগ

মধ্যপ্রাচ্যে ভেস্তে যাচ্ছে যুদ্ধবিরতি, হরমুজে ড্রোন ভূপাতিত

চার দিনে ২ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের, মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টাঘাত

সরাসরি সামরিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ওয়াশিংটনের ড্রোন ভূপাতিতের দাবি এবং এর জবাবে মার্কিন ঘাঁটিতে তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির দিকে ধেয়ে আসা ইরানের চারটি ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক’ বা আত্মঘাতী ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে মার্কিন বাহিনী। ওয়াশিংটনের দাবি, ড্রোনগুলো ওই অঞ্চলের বাণিজ্যিক সামুদ্রিক যাতায়াতের জন্য ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ তৈরি করেছিল।

শুধু ড্রোন ভূপাতিত করেই থামেনি মার্কিন বাহিনী। সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরবর্তী হামলা প্রতিরোধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জান্তা ইরানের গোরুক এবং কেশম দ্বীপে অবস্থিত উপকূলীয় নজরদারি রাডার স্থাপনাগুলোতে পাল্টা আঘাত হেনেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমান হামলার জবাবে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইরিব’ (IRIB)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুয়েতে অবস্থিত দুটি মার্কিন বিমান ঘাঁটি এবং বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর সদর দপ্তরকে লক্ষ্যবস্তু করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।

অবশ্য সেন্টকমের প্রাথমিক মূল্যায়ন দাবি করছে, উপসাগরীয় দুই দেশে ছোঁড়া ইরানের সাতটি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ছয়টিই মাঝআকাশে প্রতিহত করা হয়েছে এবং একটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিবিসি-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত কয়েকদিনের ধারাবাহিক পাল্টাপাল্টি হামলা দুই দেশের মধ্যকার নড়বড়ে যুদ্ধবিরতিকে চূড়ান্ত ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে গত বুধবার কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তথাকথিত ‘ইরানি ড্রোন’ হামলায় ১ জন নিহত এবং ৬০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

সেন্টকমের দাবি, ইরান ‘পরিকল্পিত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অন্যায়ভাবে’ এই বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। তবে আইআরজিসি এই বিমানবন্দর হামলায় তাদের সম্পৃক্ততার কথা জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে। তেহরানের পাল্টা দাবি, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) কারিগরি ত্রুটির কারণেই বিমানবন্দরে ওই ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটেছে।

“ইরানের একটি তেলবাহী ট্যাংকার এবং কেশম দ্বীপে মার্কিন আগ্রাসনের প্রতিশোধ নিতেই উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।” — আইআরজিসি (IRGC)

বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়া এবং স্থায়ী শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার ফল এই বর্তমান সংঘাত।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলার পর সমগ্র পশ্চিম এশিয়াজুড়ে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালানোর পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত অবরুদ্ধ করে দেয়। উল্লেখ্য, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই রুট দিয়েই পরিবাহিত হয়। ইরানের এই ব্লকেডের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রাতারাতি আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে।

গত এপ্রিলের শুরুতে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। উল্টো চুক্তি সইয়ের পরপরই ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নতুন করে কঠোর অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ও কঠোর হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:

“একটি চুক্তি চূড়ান্ত, অনুমোদিত এবং দ্বিপক্ষীয়ভাবে স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত ইরানের ওপর এই অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ সম্পূর্ণ কার্যকর এবং বলবৎ থাকবে।”

কূটনৈতিক মহলের ধারণা, ওয়াশিংটন যদি অবরোধ শিথিল না করে এবং তেহরান যদি হরমুজ প্রণালিতে তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা অব্যাহত রাখে, তবে এই ছায়াযুদ্ধ যেকোনো সময় পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

প্রতিবেদক

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার