‘আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যু দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের’
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যু কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, এটি আসলে একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই কথা জানান। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা, চিকিৎসকের অনুপস্থিতি এবং নার্সদের অসহযোগিতার কারণেই গত ২৭ মে তিনটি ঘণ্টার ব্যবধানে ওই ৬টি ফুটফুটে শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে।
এই নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং দেশের প্রচলিত আইনে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
এক নজরে মূল বিষয়গুলো:
-
গত ২৭ মে ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ৬ নবজাতকের মৃত্যু হয়।
-
তদন্ত কমিটির মতে, ৯০০ বর্গফুটের ছোট বদ্ধ কক্ষে ধারণক্ষমতার বাইরে রোগী ও স্বজনসহ ৫০ জন উপস্থিত ছিলেন।
-
দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকায় এবং ভেন্টিলেশন না থাকায় কক্ষে অক্সিজেনের ঘাটতি ও কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধি পায়।
-
ঘটনার সময় ওয়ার্ডে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ছিলেন না এবং নার্সরা স্বজনদের ডাকে সাড়া দেননি।
৯০০ বর্গফুটের ডেথ ট্র্যাপ: ভবনের উপযোগিতা নিয়েই প্রশ্ন
তদন্ত প্রতিবেদনের বিস্তারিত তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, মগবাজারের ওই বহুতল ভবনটি আসলে কোনো আধুনিক হাসপাতাল পরিচালনার জন্যই উপযুক্ত নয়। বিশেষ করে যে পোস্ট অপারেটিভ রুম নম্বর-২ এ ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। ৯০০ বর্গফুটের ওই ছোট কক্ষে একসাথে ১১ জন নবজাতক রোগী এবং তাদের স্বজনসহ প্রায় ৫০ জন মানুষ গাদাগাদি করে ছিলেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, ওই কক্ষে দীর্ঘ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা এসি বন্ধ ছিল। কাচ দিয়ে ঘেরা ওই বদ্ধ ঘরে আলো-বাতাস চলাচলের কোনো বিকল্প রাস্তাও রাখা হয়নি। ফলে একপর্যায়ে ভেতরের বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে কমে যায় এবং বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে শিশুরা দমবন্ধ হয়ে মারা যায়। হাসপাতালটির ভেতরে ছোট ছোট কাচের ঘরের এই নকশাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে আখ্যা দিয়েছে তদন্ত দল।
চিকিৎসকের অভাব ও নার্সদের চরম নিষ্ঠুরতা
তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতালটির নার্স ও স্টাফদের পেশাগত অসদাচরণ এবং অমানবিক আচরণের প্রমাণ মিলেছে। ভোররাতে শিশুদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করলে স্বজনরা চিৎকার করে নার্সদের ডাকলেও তারা এগিয়ে আসেননি। এমনকি জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো কোনো ন্যূনতম প্রশিক্ষণ বা ইমার্জেন্সি মেডিকেল রেসপন্স ব্যবস্থা হাসপাতালটির ছিল না।
সবচেয়ে বড় গাফিলতি ছিল, ওই পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের রোগীদের সার্বক্ষণিক দেখাশোনার জন্য কোনো অন-ডিউটি চিকিৎসকই ছিলেন না। নার্সরা চিকিৎসকদের ফোন করার বা জানানোর কোনো প্রয়োজনই বোধ করেননি। ফলে পুরো হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার এই লাগামহীন ও চরম অব্যবস্থাপনার দায় সরাসরি আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে হাসপাতালটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েছে এবং আগামী রবিবারের মধ্যে এর লাইসেন্স বাতিলসহ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই বিষয়ের সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
তদন্ত কমিটির মতে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যু হওয়ার মূল কারণ কী?
তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ছোট বদ্ধ কক্ষে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত মানুষ থাকা, দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প ভেন্টিলেশন না থাকায় কক্ষে তীব্র অক্সিজেন স্বল্পতা তৈরি হয়। এর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে শিশুরা শ্বাসরোধে মারা যায়।
ঘটনার সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কী কী গাফিলতি পাওয়া গেছে?
পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। শিশুদের অবস্থা খারাপ হলেও কর্তব্যরত নার্সরা স্বজনদের ডাকে সাড়া দেননি বা চিকিৎসকদের জানাননি। এছাড়া জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কোনো প্রস্তুতিও হাসপাতালের ছিল না।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যু – তথ্য সংযোগ





