জাতীয় ফিচার

হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ: রবীন্দ্রসরোবরে ভোরের আলোয় ১৪৩৩-কে আবাহন

হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ: রবীন্দ্রসরোবরের ভোরের আলোয় ১৪৩৩-কে আবাহন

বর্ষবরণে রাতের আঁধার কাটিয়ে ভোরের সূর্য উঁকি দেওয়ার আগেই মঙ্গলবার রূপ বদলে যায় রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরের। চ্যানেল আই ও সুরের ধারার যৌথ আয়োজনে হাজারো শিল্পীর সমবেত কণ্ঠে নতুন বঙ্গাব্দ ১৪৩৩-কে স্বাগত জানানো হয়। সংগীত, প্রকৃতি আর প্রাণের গভীর মেলবন্ধনে মুখরিত হয়ে ওঠে লেকপাড়ের এই অবারিত প্রাঙ্গণ।

মঙ্গলবার ভোর থেকেই উৎসবপিয়াসী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে রবীন্দ্রসরোবর। তখনো ধানমন্ডি লেকের শান্ত জলে ভোরের সোনারাঙা আভা পড়েনি, কিন্তু তার আগেই সাদা-লাল শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে সজ্জিত হাজারো বাঙালির উপস্থিতি জানিয়ে দেয়—আজ বাঙালির নবজাগরণের দিন। পুরোনো বছরের জরা ও গ্লানি মুছে নতুনের আহ্বানে এই আয়োজিত উৎসব যেন হয়ে ওঠে এক সম্মিলিত জাতীয় আবেগের অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

সেতারের মূর্ছনায় শুরু, গানের জোয়ারে শেষ

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় প্রখ্যাত শিল্পী নিশীথ দের সেতার পরিবেশনার মাধ্যমে। ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়ায় সেতারের সেই ধ্রুপদী সুর চারদিকে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। এরপর মঞ্চে আসেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার নেতৃত্বে ‘সুরের ধারা’র কয়েকশ শিল্পী। সমবেত কণ্ঠে যখন বেজে ওঠে—‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’, তখন উপস্থিত হাজারো দর্শক-শ্রোতাও কণ্ঠ মেলান সেই চেনা সুরে।

এবারের আয়োজনে কেবল রাজধানীর বাসিন্দারাই নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নবীন-প্রবীণ শিল্পীরাও অংশ নিয়েছেন। এটি কেবল একটি বর্ষবরণের অনুষ্ঠান ছিল না, বরং এটি হয়ে ওঠে এক বৃহৎ সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। লেকের পাড়ে বসে মানুষ যেন ক্ষণিকের জন্য যান্ত্রিক নগরীর কোলাহল ভুলে শেকড়ের টানে একাত্ম হয়ে পড়ে।

উৎসবের নেপথ্যে ও নিরাপত্তা

চ্যানেল আই ও সুরের ধারা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই বিশাল উৎসবটি আয়োজন করে আসছে। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের এই আয়োজনকে ঘিরে পুরো ধানমন্ডি এলাকা বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকা ছিল। প্রতিটি প্রবেশপথে ছিল কঠোর তল্লাশি, তবে উৎসবের আমেজে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। ছোট থেকে বড়—সবার কপালে আঁকা ছিল আলপনা, হাতে ছিল প্লাকার্ড আর মুখে ছিল ভোরের অমলিন হাসি।

পয়লা বৈশাখ ১৪৩৩-এর আয়োজনে যা ছিল বিশেষ:

  • যৌথ আয়োজন: চ্যানেল আই এবং রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার নেতৃত্বাধীন ‘সুরের ধারা’র সম্মিলিত প্রয়াস।

  • সহস্র কণ্ঠ: কয়েকশ পেশাদার শিল্পীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কণ্ঠে গান।

  • সেতার বাদন: অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ হিসেবে ভোরের প্রথম সুর তুলে ধরেন নিশীথ দে।

  • ডিজিটাল সম্প্রচার: প্রবাসীদের জন্য পুরো অনুষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

  • ঐতিহ্যের প্রতিফলন: বৈশাখী মেলা না থাকলেও ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের ছোট ছোট স্টল ছিল উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ।

সাংস্কৃতিক নবজাগরণ ও আগামীর ভাবনা

আয়োজক ও সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগেও বাঙালির এই স্বকীয়তা রক্ষা করা জরুরি। রবীন্দ্রসরোবরের এই অনুষ্ঠান প্রমাণ করে যে, রাজনীতি কিংবা অর্থনৈতিক অস্থিরতার ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালি জাতি এখনো তার সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে জানে। হাজারো মানুষের এই মহামিলন কেবল একটি দিন উদযাপনের জন্য নয়, বরং এটি সারা বছরের জন্য সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার শপথ।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
জাতীয়

সম্মেলন করে নির্বাচনি প্রচারণার নামার ঘোষণা শামীম ওসমানের

সংবাদ সম্মেলন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে নামার ঘোষণা দিয়েছেন সাংসদ শামীম ওসমান। সিটি নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র