৭শ শিক্ষার্থী’র স্বপ্ন বাঁচালেন মানবিক রেল কর্মকর্তা অসীম কুমার তালুকদার
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার অসীম কুমার তালুকদার যেন অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন। অনেক বাধা বিপত্তি পার করে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেল ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনার স্রষ্টা হিসেবে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইলেন তিনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য রাজশাহী গামী প্রায় ট্রেনে থাকা প্রায় ৭০০ শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ার হাত থেকে তাদের রক্ষা করলেন। এসব শিক্ষার্থীকে যথাসময়ে পরীক্ষার হলে পৌঁছে দেয়ার সব দায়িত্ব নিলেন তিনি।
মার্চের ৫ তারিখ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সেই পরীক্ষায় অংশ নিতে ৭০০ এর মতো শিক্ষার্থী ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেসে চেপে বসেন। বিকেল ৩ টা ৩০ মিনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন বলে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় গোড়া থেকেই! রেল ব্রোকেনের ফলে ধূমকেতু এক্সপ্রেস ঢাকা থেকেই বেশ বিলম্বে রওনা হয়। সকাল ১১টার দিকে হিসেব করে দেখা গেলো, ট্রেনটি রাজশাহী স্টেশনে পৌঁছাতে বিকেল ৩টার মতো বাজবে। তখন থেকেই কাজ শুরু করেন অসীম কুমার তালুকদার। পরীক্ষার্থীদের সময়ের ব্যাপারে চিন্তা করে ধূমকেতু এক্সপ্রেসকে এগিয়ে নিয়ে আসেন অন্য কয়েকটি ট্রেনকে বসিয়ে রেখে।
তারপরেও ভাগ্য সহায় হয়নি। লাহেড়ী মোহনপুর স্টেশনে এসে ধূমকেতুর ইঞ্জিন ফেইল করে। ফলে ট্রেনটির চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। তখনও এগিয়ে আসেন অসীম কুমার তালুকদার।আবারো পরীক্ষার্থীদের জন্য শরৎনগরে থাকা চিলাহাটি এক্সপ্রেস ট্রেনটির ইঞ্জিন কেটে এনে ধূমকেতু এক্সপ্রেসে সেট করে আবার ধূমকেতু এক্সপ্রেসটি সচল করান। কিন্তু ততোক্ষণে আরো ঘণ্টাদেড়েক সময় নষ্ট হয়ে গিয়েছে। হিসেব করে দেখা যায় ট্রেনটি বিকেল ৪টায় রাজশাহী স্টেশনে পৌঁছুবে।
এইসময়ে আর কোনো উপায় না পেয়ে অসীম কুমার তালুকদার রাজশাহী ইউনিভার্সিটির ভিসিকে পরীক্ষার সময় পিছিয়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানান। পাশাপাশি ট্রেনের লোকো পাইলটকে সর্বোচ্চ গতিতে ট্রেন চালানোর নির্দেশ দেন। সাথে যোগাযোগ রাখেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যারের সাথে। তারপরও সময় বাঁচাতে আড়ানি স্টেশনের স্টপেজে ট্রেন না থামানোর নিদের্শ দেন। অবশেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে ট্রেন গিয়ে পৌঁছে বিকেল ৩ টা ৩৮ মিনিটে। কিন্তু ৪টার মধ্যে হলে ঢুকতে হবে!
তখন আবারো তিনি ভিসিকে অনুরোধ জানালেন শিক্ষার্থীদের হলে ঢোকার সুযোগ দেয়ার জন্য। অসীম কুমার তালুকদারের অনুরোধেই শিক্ষার্থীদের হলে ঢুকতে দিলেন ভিসি। এভাবেই প্রায় ৭০০ শিক্ষার্থী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিশ্চিত মিস হতে যাওয়া পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারলো। কোনো দৈব বলে নয়, একজন অসীম তালুকদারের একান্ত প্রচেষ্ঠায়। যার সাথে যোগ দিয়েছিলেন রেলের অংসখ্য কর্মী।
ইন্ডিয়ান ওয়েব সিরিজ “দ্যা রেলওয়ে ম্যান” আমরা অনেকেই তো দেখেছি। জেনেছি রেল কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের অসামান্য অবদানের কথা। রেলের অসংখ্য দূর্নীতি অনিয়মের মধ্যে একজন অসীম কুমার তালুকদার যেন বহন করছেন এক আলোকবর্তীকা।
দশম বিসিএস রেলওয়ে প্রকৌশল ক্যাডারের কর্মকর্তা সহকারী প্রকৌশলী হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন অসীম কুমার তালুকদার। তিনি পর্যায়ক্রমে পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের সিপিও, টিআরএম, পশ্চিম রেলের বিভাগীয় ম্যানেজার (ডিআরএম), সিএস ও প্রধান টেলিকম প্রকৌশলী, সরকারি রেল পরিদর্শকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। একজন শ্রেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসাবে তিনি শুদ্ধাচার পুরস্কার-২০২০ লাভ করেন। এ ছাড়া ২০২০-২১ সালে রেল মন্ত্রণালয়ের শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবক মনোনীত হন অসীম কুমার তালুকদার।
আরও পড়ুনঃ বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন: প্রধানমন্ত্রী





