২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ: সাবেক আইজিপির জবানবন্দি
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগের রাতে ৫০ শতাংশ ভোট ব্যালট বাক্সে ভরে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারী। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, যিনি আসামি থেকে রাজসাক্ষী হয়েছেন। মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-০১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে জবানবন্দি দিতে গিয়ে তিনি এই তথ্য জানান। জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশ প্রধানের দায়িত্বে থাকা মামুন সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে তার সাক্ষ্য প্রদান শুরু করেন।
চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের রাতে তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ৫০ শতাংশ ভোট ব্যালট বাক্সে ভরে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এছাড়া, তিনি পুলিশে ‘গোপালগঞ্জ সিন্ডিকেট’-এর অস্তিত্ব এবং এর প্রভাব সম্পর্কেও তথ্য প্রকাশ করেন।
মামুন আরও বলেন, জুলাই আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার, হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানো এবং ব্লক রেইডের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে নেওয়া হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ এসেছিল সরাসরি শেখ হাসিনার কাছ থেকে। সাবেক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিব এবং গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) হারুন মারণাস্ত্র ব্যবহারে অতিরিক্ত উৎসাহী ছিলেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
জবানবন্দিতে মামুন প্রকাশ করেন, র্যাব-১-এর অধীনে ‘টিআইএফ’ নামে একটি গোপন বন্দিশালা ছিল। অন্যান্য র্যাব ইউনিটেও এ ধরনের বন্দিশালা ছিল। এসব বন্দিশালায় রাজনৈতিক ভিন্নমত পোষণকারী বা সরকারের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের আটক করা হতো। তিনি জানান, এসব নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আসতো। কখনো কখনো এই নির্দেশনা প্রদান করতেন তারেক সিদ্দিকী। আয়নাঘরে আটক এবং ক্রসফায়ারে হত্যার মতো ঘটনাগুলো পরিচালনা করতেন র্যাবের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এডিসি) অপারেশন ও গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক।
চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন এ বছরের ২৪ মার্চ মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনি জানান, তিনি স্বেচ্ছায় আসামি থেকে রাজসাক্ষী হয়েছেন এবং সত্য উন্মোচনের জন্য এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং এই সময়ের বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেন।
এর আগে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তি, শহীদদের পরিবারের সদস্য এবং চিকিৎসকসহ ৩৫ জন সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। প্রসিকিউশন আশা করছে, এই মাসের মধ্যেই এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হবে। ট্রাইব্যুনালে এই জবানবন্দি এবং সাক্ষ্যগুলো মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মামুনের জবানবন্দি থেকে আরও জানা যায়, পুলিশের মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব এবং নির্দেশনার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে নিরপেক্ষতা ব্যাহত হচ্ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতো।





