হাসিনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু: গুলিতে মুখাবয়ব বিকৃত হওয়া খোকন চন্দ্র যা জানালেন!
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচার শুরু হয়েছে।
রোববার (৩ আগস্ট ২০২৫) বেলা সাড়ে ১১টায় বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে সূচনা বক্তব্য ও প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক বিচারকার্য শুরু হয়।
প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে মুখাবয়ব বিকৃত হওয়া মাইক্রোবাসচালক খোকন চন্দ্র বর্মণ, যিনি শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন।
খোকন চন্দ্র বর্মণের হৃদয়বিদারক সাক্ষ্য
খোকন চন্দ্র বর্মণ আদালতে জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার সামনে পুলিশের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। গুলি তাঁর মুখ, বাঁ চোখ ও নাক লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয়, যার ফলে তাঁর মুখের উপরের ঠোঁট, মাড়ি, নাক ও তালু পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। আদালতে তিনি মাস্ক খুলে তাঁর বিকৃত মুখাবয়ব দেখান, যা উপস্থিত সবাইকে শিহরিত করে।
তিনি বলেন, “যারা হাজার হাজার মানুষকে মেরেছে, তাদের জন্য শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এবং সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান দায়ী। আমি তাদের বিচার চাই।”
খোকন চন্দ্র আরও জানান, গুলির আঘাতে তাঁর মুখের হাড় ভেঙে যায় এবং চিকিৎসার জন্য তাঁকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর মুখের থ্রিডি মডেল তৈরি করে টাইটেনিয়াম প্লেট বসানো হয় এবং অস্টিওসিন্থেসিস করা হয়। অপারেশনের সময় তাঁর মুখ থেকে তিন-চারটি ছররা বুলেটের অংশ বের করা হয়। গত ৭ মে তিনি দেশে ফিরলেও তাঁর চিকিৎসা এখনো চলমান।
ট্রাইব্যুনালে জেরা ও সূচনা বক্তব্য
খোকন চন্দ্রের সাক্ষ্যের পর শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন তাঁকে জেরা করেন। আমির হোসেন প্রশ্ন করেন, “আপনি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে দায়ী করলেন, তার দলিল আছে?” খোকন জবাব দেন, “না।”
এছাড়া আমির হোসেন দাবি করেন, আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা পুলিশের ওপর আক্রমণ করেছিল, যাতে যাত্রাবাড়ীতে ১৩-১৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত এবং অনেকে আহত হন।
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনকারীরা দেশি অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছিল, যাতে খোকন আহত হন। খোকন এই দাবি অস্বীকার করে বলেন, “এসব কথা অসত্য।”
বিচারকার্যের শুরুতে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সূচনা বক্তব্যে বলেন, “শেখ হাসিনা এই সকল অপরাধের নিউক্লিয়াস।”
তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে “রাজাকারের বাচ্চা” ও “রাজাকারের নাতিপুতি” বলে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। এর ফলে তৎকালীন সরকারের প্ররোচনায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালায়, যাতে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজার আহত হন।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সূচনা বক্তব্যের আগে বলেন, এই মামলার আসামিদের প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক।
মামলার অভিযোগ ও আসামিরা
এই মামলায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়, শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালায়।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, হাসিনা হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূলের নির্দেশ দেন, যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি বাস্তবায়ন করেন।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামাল ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনের অডিও রেকর্ডে প্রমাণিত হয়, তিনি মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট চানখাঁর পুল এলাকায় পুলিশ ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করে।
পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, সাভারের আশুলিয়া থানার সামনে পুলিশ ছয়জনকে হত্যা করে এবং লাশ পুড়িয়ে ফেলে। এই অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে শেখ হাসিনা ও অন্যান্য আসামিদের বিরুদ্ধে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’ এর দায়ে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
মামলার অন্যতম আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন নিজের দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন। তাঁর পক্ষে আইনজীবী হিসেবে আছেন জায়েদ বিন আমজাদ। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক থাকায় তাঁদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন দায়িত্ব পালন করছেন।





