সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা
মন্ত্রিসভা সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক
আজ সোমবার এ অনুমোদন দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ২১ ধারার সাজা আরও কমানোর পাশাপাশি কয়েকটি ধারায় বিশেষ পরিবর্তন এনে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা ও প্রচারণা চালান বা তাতে মদদ দেন, তাহলে তিনি অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে সাজা হবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা তিন কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।
এর আগে গত ৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩’ এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন এ তথ্য জানান।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অনেক ধারা পরিবর্তন করে নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। নতুন আইন পাস হলে আগেরটি বাতিল হবে।
সাইবার নিরাপত্তা আইনের মোট ধারা রয়েছে ৬০টি। যার মধ্যে ২৭ ও ৩৩ নং ধারাতেই সর্বোচ্চ সাজা নির্ধারণ করা হয়েছে। ধারা দুটোতে বলা হয়েছে, সাইবার সন্ত্রাসী কার্য সংঘটন (২৭ ধারা) ও হ্যাকিং সংক্রান্ত (৩৩ ধারা) অপরাধ ও দণ্ডে যদি কোনো ব্যাক্তি অপরাধ করেন তাহলে তাকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এরপরেই রয়েছে ২১ ও ১৯ নম্বর ধারা।
যাতে বলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা বা প্রচারণা (২১ ধারা) মূলক অপরাধ করলে তাকে ৭ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, ইত্যাদির ক্ষতিসাধন (১৯ ধারা) কেউ করলে তাকে ৭ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
তবে ২১ ও ১৯ ধারার কাছাকাছি সাজা রয়েছে ১৭ নং ধারার (ক) ও (খ) বিভাগের দুটোতেই। ১৭ নং ধারার (ক) বিভাগে আছে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশ করলে ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর (খ) বিভাগে আছে, বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে ক্ষতিসাধন, বিনষ্ট, অকার্যকর করেন বা করার চেষ্টা করেন তাহলে তাকে ৬ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
এদিকে নতুন আইনে যেসব পরিবর্তন আসছে তার মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মানহানির মামলায় আগে জামিন অযোগ্য জেল ও জরিমানার বিধান ছিল। নতুন আইনে ডিজিটাল মাধ্যমে মানহানিকর তথ্য প্রচার ও প্রকাশ করার ক্ষেত্রে আর কারাদণ্ডের বিধান থাকছে না। কারাদণ্ড বাতিল করে সেখানে শাস্তি হিসেবে জরিমানা রাখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩’ এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
এভাবেই অপরাধ ও সাজার পরিমাণ করা হয় সংশোধিত নতুন সাইবার নিরাপত্তা আইনে। যার মধ্যে ১৭, ১৯, ২১, ২৭, ৩০ ও ৩৩ ধারা ছাড়া বাকিগুলোকে জামিন যোগ্য করা হয়েছে। এ ছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দ্বিতীয়বার অপরাধ করলে সাজা বাড়ানো হয়েছিল। তবে নতুন আইনে তা একেবারেই বাদ দেয়া হয়েছে।
নতুন সাইবার নিরাপত্তা আইনে পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৯ ধারায় মানহানির বিষয়টি রয়েছে। এতে বলা আছে, যদি কোনও ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক বিন্যাসে পেনাল কোডের (দণ্ডবিধি) সেকশন ৪৯৯-এ বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, সে জন্য তিনি অনধিক তিন বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লাখ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর যদি কোনও ব্যক্তি উপধারা (১)-এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃ পুনঃ সংঘটন করেন, তাহলে ওই ব্যক্তি অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। প্রস্তাবিত আইনে এই অপরাধের জন্য কারাদণ্ড বাদ দিলেও জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।
এ ছাড়া নতুন সাইবার নিরাপত্তা আইনে সাইবার নিরাপত্তার জন্য যেসব ধারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ছিল, সেই ধারা প্রস্তাবিত আইনে অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। তবে অনেকগুলো ধারা পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন আইন অনুযায়ী, একটা সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি থাকবে। এ ছাড়া আগের আইনে জেলের বিধান বেশি ছিল। নতুন আইনে জরিমানার পরিমাণ বেশি রাখা হয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৮ ধারা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার বা উসকানি অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করান, যা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত করে, তাহলে এই ব্যক্তির এই কাজ হবে একটি অপরাধ। কোনও ব্যক্তি এই অপরাধ সংঘটন করলে তিনি অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। আর এই অপরাধ দ্বিতীয় বার করলে সাজা আরও বেশি হবে।
প্রস্তাবিত আইনে এটি (২৮ ধারা) পরিবর্তন করে জামিনযোগ্য করা হয়েছে (আগে অজামিনযোগ্য ছিল) এবং সাজা কমানো হয়েছে। এখন এই অপরাধে সাজা হবে সর্বোচ্চ দুই বছর। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩১ ধারাও পরিবর্তন করা হচ্ছে প্রস্তাবিত আইনে। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটার উপক্রম হয়, তাহলে ওই ব্যক্তির অনধিক ৭ বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। প্রস্তাবিত নতুন আইনে সাজা কমিয়ে ৫ বছর করা হয়েছে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধের বাড়তি সাজা বাতিল করা হয়েছে।
সূত্রঃ বাসস
আরও পড়ুনঃ জি২০ সম্মেলনে অংশ নেবেন শেখ হাসিনা





