অন্যান্য ফিচার বিশ্ব সংযোগ

নেপালে জেন জি আন্দোলন: সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে সরকারের সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধকরণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেন জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে পৌঁছেছে। শতাধিক বিক্ষোভকারী, সাংবাদিক এবং নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা চলছে।

নিহতদের মধ্যে ছয়জন ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারে, তিনজন সিভিল হাসপাতালে, তিনজন এভারেস্ট হাসপাতালে, একজন কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজে এবং একজন ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে মারা গেছেন। আহতদের সংখ্যা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি, তবে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় কিছু রোগীকে অন্যান্য চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হচ্ছে। অনেক নিহত ও আহতের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

সোমবার (৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫) সকাল থেকে কাঠমান্ডুর মাইতিঘর এলাকায় হাজার হাজার তরুণ, যাদের অধিকাংশ জেন জি (১৯৯৫-২০১০ সালে জন্মগ্রহণকারী) প্রজন্মের, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউবসহ ২৬টি সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা “দুর্নীতি বন্ধ করো, সামাজিক মাধ্যম নয়”, “সামাজিক মাধ্যমের নিষেধাজ্ঞা তুলে নাও” এবং “দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণ” স্লোগানে জাতীয় পতাকা হাতে রাস্তায় নামেন। বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ভবনের নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করার চেষ্টা করলে পুলিশ জলকামান, টিয়ারগ্যাস এবং রাবার বুলেটের পাশাপাশি সরাসরি গুলি চালায়, যা সংঘর্ষকে তীব্র করে।

প্রতিবাদকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে পার্লামেন্ট প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে, সেখানে একটি অ্যাম্বুলেন্সে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশের দিকে গাছের ডাল ও পানির বোতল ছুড়ে। একজন প্রতিবাদকারী জানান, “পুলিশ এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়েছে। আমার পাশে থাকা এক বন্ধু হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে।” সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হয়েছেন, যার মধ্যে নয়া পত্রিকার দীপেন্দ্র ধুঙ্গানা, নেপাল প্রেসের উমেশ কার্কি এবং কান্তিপুর টেলিভিশনের শ্যাম শ্রেষ্ঠ রাবার বুলেটে আহত হয়ে সিভিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঠমান্ডু জেলা প্রশাসন দুপুর ১২:৩০ থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নিউ বানেশ্বর, শিতল নিবাস (রাষ্ট্রপতির বাসভবন), লাইনচৌর (সহ-রাষ্ট্রপতির বাসভবন), বালুয়াতার (প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) এবং সিংহ দরবারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কারফিউ জারি করেছে। প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে পোখারা, বুটবল, চিতওয়ান, নেপালগঞ্জ, বিরাটনগর এবং ঝাপার দামাকে। দামাকে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির কুশপুত্তলিকা পোড়ায় এবং পৌরসভা কার্যালয়ের গেট ভাঙার চেষ্টা করে, যার জবাবে পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়ে একজনকে গুরুতর আহত করে।

নেপাল সরকার গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করে, দাবি করে যে এই প্ল্যাটফর্মগুলো সরকারি নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করেনি এবং ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, মিথ্যা তথ্য এবং জালিয়াতি ছড়ানো হচ্ছে। এই নিষেধাজ্ঞা দেশের পর্যটন শিল্প, ব্যবসা এবং বিদেশে থাকা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। নেপাল মানবাধিকার কমিশন পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়ে সরকারকে তরুণদের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ তীব্র হওয়ায় তিনি জরুরি মন্ত্রিসভা বৈঠক ডেকেছেন। ‘হামি নেপাল’ নামে একটি এনজিও এই বিক্ষোভের আয়োজন করে, যারা ভিপিএন ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমে সমন্বয় করছে। বিক্ষোভে নেপালের শিল্পী, অভিনেতা এবং বিনোদন জগতের ব্যক্তিত্বরাও সমর্থন জানিয়েছেন। এই আন্দোলন কেবল সামাজিক মাধ্যম নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে নয়, বরং দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও কুশাসনের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভের প্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার