ঈদের আগেই ৫০ লাখ পরিবারের হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’: প্রতিশ্রুতি পূরণে জোরকদম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি তাদের ঘোষিত ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে। আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই পরীক্ষামূলকভাবে দেশের কয়েকটি অঞ্চলে প্রান্তিক পরিবারের হাতে এই কার্ড তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
সরকারি সূত্র বলছে, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ হবে স্বল্পআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তার একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম। নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ২ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। সেই হিসাবে এক অর্থবছরে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১২ হাজার ৭২ কোটি টাকা—ক্যাশ-আউট চার্জসহ।
কীভাবে কাজ করবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’?
নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, এটি কেবল একটি পরিচয়পত্র নয়; বরং ডিজিটাল ডেটাবেইস-নির্ভর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। উপকারভোগীরা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে সরাসরি অর্থ পাবেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগী কমবে, অনিয়মের সুযোগও সংকুচিত হবে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদ্যমান ভাতা কর্মসূচি—বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের উপকারভোগীদের তথ্য একত্রিত করা হবে। ফলে একই পরিবার একাধিক সুবিধা পাচ্ছে কি না, তা যাচাই সহজ হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সমন্বয়ের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্থ সাশ্রয় সম্ভব।
আর্থিক চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ২ হাজার টাকা দেওয়া মানে বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি একটি বড় অঙ্ক হলেও দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের কাঠামো পুনর্বিন্যাস করলে অর্থের জোগান অসম্ভব নয়। অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি ও অদক্ষ ব্যয় কমিয়ে এই কর্মসূচির অর্থায়ন করা যেতে পারে।
তবে প্রশ্ন রয়েছে লক্ষ্যভিত্তিক নির্বাচন নিয়ে। প্রকৃত দরিদ্র পরিবার চিহ্নিত করা, তথ্যভান্ডার হালনাগাদ রাখা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তালিকা তৈরি—এই তিনটি বিষয় হবে কর্মসূচির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি
সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলা ও উপজেলা বাছাই করেছে পাইলট প্রকল্পের জন্য। ঈদের আগেই এসব এলাকায় কার্ড বিতরণ শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরীক্ষামূলক প্রয়োগে যে ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়বে, তা দ্রুত সংশোধন করে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে।
মূল তথ্যসংক্ষেপ
- ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ২ হাজার টাকা সহায়তার পরিকল্পনা।
- বার্ষিক সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১২ হাজার ৭২ কোটি টাকা।
- বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ।
- ঈদের আগেই কয়েকটি অঞ্চলে পরীক্ষামূলক বিতরণ শুরু।
রাজনৈতিক অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়ন
নির্বাচনের সময় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ছিল বিএনপির প্রচারণার অন্যতম আকর্ষণ। ভোটারদের কাছে এটি ছিল সরাসরি সহায়তার প্রতিশ্রুতি। এখন সরকারে এসে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে দলটি। বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম বছরেই কর্মসূচির কার্যকারিতা প্রমাণ করতে পারলে এটি সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক পুঁজি হয়ে উঠতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কেবল অর্থ বিতরণের বিষয় নয়; এটি প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিরও পরীক্ষা। সরকার যদি সঠিকভাবে উপকারভোগী নির্বাচন, তদারকি ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ হতে পারে দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়।





