শ্রুতি নাটক ও গানে গানে আহির ভৈরবীকে স্মরণ
করোনা সংক্রমণে সারা বিশ্ব যখন স্থবির; তখন বাংলাদেশ জুড়েও ছিল নিস্তব্ধতা। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যেত না কেউ। সরকারি বিধি নিষেধের আওতায় সবাইকে চলতে হতো। কারো কোন কাজ ছিল না, এক অজানা আতঙ্কে সময় কাটতো প্রায় প্রতিটি মানুষের। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই আসতো অসংখ্য মৃত্যু সংবাদ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও প্রতিদিন পাওয়া যেত অনেকের মৃত্যু সংবাদ। হাসপাতালে শয্যা খালি ছিল না। কারো মৃত্যু হলে পরিবারের সদস্য আত্মীয়-স্বজন কেউই ভয়ে আতঙ্কে মৃত ব্যক্তির পাশেও যেতেন না। অজানা আতঙ্কে পুরো দেশটাই যেন এক নিস্তব্ধ জনশূন্য হয়ে পড়েছিল তখন।
সেই স্থবির সময়ে মানুষের মনে সাহস জোগাতে, আনন্দ যোগাতে এবং তাদের সময় ক্ষেপণের বড় উপায় ফিরিয়ে দিতে অনেকেই ভার্চুয়াল মাধ্যমে নানা আয়োজন করেছেন। আবৃত্তি সংগীত নৃত্যসহ এমন নানা পরিবেশনায় যুক্ত হয়ে দিন কাটতো অনেক পরিবারের। এমনই এক অনুষ্ঠানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় সরাসরি আয়োজনে গান শুনিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে করেছিল আহির ভৈরবী নামে শিশু শিল্পী ও তার মা ভারতের শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী রমা বাড়ৈ।
নিজ বাসা থেকেই প্রতিদিন সন্ধ্যায় সরাসরি অনুষ্ঠানে তাদের পরিবেশিত গান বাংলাদেশ এবং ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাংলা ভাষাভাষী মানুষের বড় প্রিয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।
কিন্তু ২০২০ সালের অক্টোবরে আকস্মিকভাবে অকালেই হারিয়ে যায় জনপ্রিয় এই শিশু শিল্পী আহির ভৈরবী। তাঁর মৃত্যু সবাইকে বেদনাহত করে। তার মৃত্যুর দু’বছর পরেও নানাভাবে তাকে স্মরণ করছে আত্মীয়-স্বজন পরিবারসহ শুভাকাঙ্ক্ষীরা।

তাকে স্মরণ করেই দেশ বরেণ্য আবৃত্তিকার, সঙ্গীত শিল্পীরা রোববার সন্ধ্যায় সমবেত হয়েছিলেন রাজধানীর মগবাজারে তাদেরই নিজ বাসায়। গান ও ভালোবাসায় এমন ভৈরবী সন্ধ্যা তারাকে স্মরণ করতে সমবেত হন দেশের গুনী এসকল সুর সাধকগণ। আহির ভৈরবীর মা প্রখ্যাত শিল্পী রমা বাড়ৈ এবং বাবা বরেণ্য চিকিৎসক রঞ্জিত বাড়ৈয়ের আয়োজনে এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন গুণীজনরা।

এদের মধ্যে ছিলেন, বরেণ্য রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী সাদী মোহাম্মদ ও তপন মাহমুদ, বিশিষ্ট আবৃত্তি শিল্পী ভাস্কর বন্দোপাধ্যায়। এছাড়াও ছিলেন, নাজমুল আহসান, সাঈদা রহমান পাপড়ি, তনুশ্রী দিপক, নাসরীন সুলতানা, আহমেদ নেওয়াজ সেরা, নাসরিন বেগম, অপরাজিতা, মুন্নী, তমা, নির্ঝর সহ গীটার শিল্পী বকুল ও সংগীত গবেষক খালিদ খলিল সহ অসংখ্য গুনীজন। এসব গুণীজন সংগীত, আবৃত্তি, স্মৃতি নাটক পরিবেশনের পাশাপাশি তাদের বক্তব্যে স্মরণ করেন, আহির ভৈরবী’কে।
আহিরকে স্মরণ করে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আহিরের পার্থীব শরীর উপস্থিত না থাকলেও, তাঁর আত্মার উপস্থিতি যেন বিরাজমান ছিলো।

দেশ বরেন্য রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী সাদী মোহাম্মদ বলেন , করোনা কালে আমরা যখন ভীত ছিলাম মুগ্ধ হয়ে মা- মেয়ের গান শুনতাম- কতো সাবলীল প্রানবন্ত ছিলো ওর কন্ঠ। তিনি বলেন, আমরা যেখানে এখনো একটি অনুস্ঠান করতে গেলে শংকায় থাকি সেখানে আহির কতো সাবলীল ও প্রানবন্ত ভাবে গানগুলো পরিবেশন করতো। যতোদিন বেঁচে থাকবো মনে হবে আহির আমার পাশেই আছে ও আমাদের সাথেই আছে, ‘তারা হয়ে আমাদের দেখছে সবসময়’ এভাবেই উল্লেখ করেন সাদী মোহাম্মদ।
দেশের আরেক বরেন্য শিল্পী তপন মাহমুদ বলেন, যখন আহিরের গানগুলো শুনতাম ভেবেছিলাম ” আহির আমাদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত ।”

সুর্য যখন অস্ত যায়, তারাগুলো মহাকাশে মিটিমিটি করে জ্বলতে থাকে আর সবার সঙ্গে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আবেগ-অনুভুতির হাজারো কথা বলে। এই নশ্বর পৃথিবীতে “ভৈরবী” তেমনই একটা তারার নাম।

যেখানে থাকুক , এতো গুনীজনের প্রার্থনায় আহিরের আত্মা চির শান্তিতে থাকবে, পরিবারের পক্ষ থেকে এদিন এই কামনাই করা হয়। এমন আয়োজনে যুক্ত হওয়ায় সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
আরও পড়ুনঃ বিত্তবানদের মানবিক সহায়তায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায় রিতা দাস





