জীবনযাপন ফিচার

ফ্রিজ ছাড়াই ভালো থাকবে কোরবানির মাংস: জেনে নিন ৫ জাদুকরী পদ্ধতি

ফ্রিজ ছাড়াই ভালো থাকবে কোরবানির মাংস: জেনে নিন ৫ জাদুকরী পদ্ধতি

পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ আর ব্যস্ততার বড় একটা অংশ জুড়ে থাকে কোরবানির মাংস বণ্টন এবং তা সংরক্ষণ। তবে প্রতিবছরই একটা সাধারণ সমস্যায় পড়েন অনেকেই—ফ্রিজের সীমিত জায়গায় বিপুল পরিমাণ মাংসের সংকুলান না হওয়া। কিন্তু প্রযুক্তির এই যুগে আমরা ভুলে যেতে বসেছি যে, ফ্রিজ ছাড়াও মাংস দীর্ঘদিন একদম তাজা রাখা সম্ভব।

শত বছর ধরে আমাদের দাদি-নানিরা কোনো কৃত্রিম হিমাগার ছাড়াই মাংস সংরক্ষণ করেছেন চমৎকার সব দেশীয় পদ্ধতিতে। পুষ্টিগুণ বজায় রেখে ফ্রিজ ছাড়াই মাংস ভালো রাখার এমন ৫টি কার্যকর ও ঐতিহ্যবাহী উপায় নিয়ে আমাদের আজকের বিশেষ আয়োজন।

১. চর্বিতে ডুবিয়ে রাখা (ঝাল মাংস বা ‘সিদল’)

এটি গ্রামীণ বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় এবং বৈজ্ঞানিক একটি পদ্ধতি। মাংস হাড়সহ ছোট ছোট টুকরো করে কেটে প্রথমে ভালো করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিতে হবে। এরপর লবণ, হলুদ এবং প্রচুর পরিমাণে চর্বি দিয়ে মাংসটিকে খুব ভালোভাবে জ্বাল দিতে হবে। চর্বি গলে যখন মাংসের ওপর তেলের মতো আস্তরণ তৈরি করবে, তখন তা বাতাস ঢুকতে পারে না এমন মাটির পাত্র বা বয়ামে সংরক্ষণ করতে হবে। চর্বির এই ঘন স্তরটি মাংসকে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। প্রতি ১-২ দিন পর পর পাত্রটি সামান্য গরম করে নিলে এই মাংস মাসের পর মাস ভালো থাকে।

২. কড়া রোদে শুকানো বা ‘শুঁটকি মাংস’

মাংস সংরক্ষণের সবচেয়ে প্রাচীন এবং স্বাস্থ্যসম্মত উপায় হলো রোদে শুকানো। চর্বিহীন সলিড মাংস লম্বা ফালি করে কেটে নিতে হবে। এরপর সামান্য লবণ ও হলুদ মাখিয়ে সুতোয় গেঁথে কড়া রোদে টানা ৫ থেকে ৭ দিন শুকাতে হবে। মাংসের ভেতরের সব আর্দ্রতা বা পানি শুকিয়ে যখন তা শক্ত হয়ে যাবে, তখন এটি টিন বা কাঁচের বয়ামে ভরে সাধারণ তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া যায়। রান্নার আগে হালকা গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখলেই মাংস আবার নরম হয়ে যায়।

৩. লবণে জারিত করা বা সল্টিং

লবণ হলো প্রকৃতির সবচেয়ে বড় প্রিজারভেটিভ। মাংসের টুকরোগুলোতে জ্যামিতিক হারে লবণ মাখিয়ে রাখলে ভেতরের পানি বেরিয়ে যায়, যা ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে দেয় না। মাংসের ওজনের প্রায় ২০ শতাংশ লবণ দিয়ে ভালো করে মেখে একটি পাত্রে চেপে রাখতে হবে। এই পদ্ধতিতে মাংসের স্বাদ কিছুটা নোনতা হলেও পুষ্টিগুণ নষ্ট হয় না। রান্নার সময় মাংসটি ভালো করে ধুয়ে নিলেই অতিরিক্ত লবণ দূর হয়ে যায়।

৪. লেবুর রস ও ভিনেগারে ম্যারিনেশন

ভিনেগার (সিরকা) বা লেবুর রসে থাকা অ্যাসিড মাংসের ভেতরের পিএইচ (pH) লেভেল কমিয়ে দেয়। ফলে ক্ষতিকারক জীবাণু সেখানে বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। মাংসের টুকরো পরিষ্কার করে তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিনেগার অথবা লেবুর রস এবং সামান্য লবণ মাখিয়ে কাঁচের পাত্রে রেখে দিন। এই পদ্ধতিতে ফ্রিজ ছাড়াই ৪ থেকে ৫ দিন মাংস একদম টাটকা ও নরম থাকে।

৫. মসলা দিয়ে কড়া করে ভেজে রাখা

মাংস চাকা চাকা করে কেটে আদা, রসুন, পেঁয়াজ এবং গরম মসলা দিয়ে কড়া করে ভেজে নেওয়া আরেকটি দারুণ উপায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে, ভাজার সময় যেন কোনো পানি না থাকে। মসলা ও তেলের আস্তরণ মাংসকে বাইরের বাতাস থেকে সুরক্ষিত রাখে। প্রতিদিন অন্তত দুবার এই মাংস হালকা গরম করলে এক সপ্তাহ পর্যন্ত ঘরের সাধারণ তাপমাত্রায় এটি অনায়াসে খাওয়া যায়।

মাংস সংরক্ষণের মূল নিয়ামকসমূহ

  • আর্দ্রতা বর্জন: মাংস নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ পানি। যে পদ্ধতিই বেছে নেওয়া হোক না কেন, মাংসের ভেতরের পানি পুরোপুরি শুকানো জরুরি।

  • বায়ুরোধী পাত্র: সংরক্ষণের জন্য সর্বদা কাঁচ, চিনামাটি বা ফুড-গ্রেড প্লাস্টিকের এয়ারটাইট পাত্র ব্যবহার করা উচিত।

  • পরিচ্ছন্নতা: কাটার সময় থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটা ধাপে শতভাগ হাইজিন বা পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে।

ফ্রিজের কৃত্রিম ঠান্ডায় রাখা মাংসের চেয়ে ঐতিহ্যবাহী উপায়ে সংরক্ষিত মাংসের স্বাদ ও সুগন্ধ অনেক ক্ষেত্রেই বেশি চমৎকার হয়। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকি বা ফ্রিজের জায়গার অভাব—কোনো কিছুই এখন আর কোরবানির আনন্দকে ম্লান করতে পারবে না। একটু সচেতনতা আর সঠিক পদ্ধতি জানলে প্রাচীন এই জ্ঞান আমাদের আধুনিক রান্নাঘরেও এনে দিতে পারে এক দারুণ স্বস্তি।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার