ফিচার স্বাস্থ্য

রক্তে হিমোগ্লোবিনের আধিক্য: রক্তস্বল্পতার মতোই কি বিপজ্জনক ‘পলিসাইথেমিয়া’?

রক্তে হিমোগ্লোবিনের আধিক্য: রক্তস্বল্পতার মতোই কি বিপজ্জনক ‘পলিসাইথেমিয়া’?

রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া বা রক্তস্বল্পতা নিয়ে আমাদের উদ্বেগের শেষ নেই। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটি আরও ভয়াবহ হতে পারে। চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন, রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা প্রয়োজনের চেয়ে বেড়ে যাওয়া বা ‘পলিসাইথেমিয়া’ শরীরের জন্য বড় ধরনের বিপদের সংকেত হতে পারে, যা অনেক সময় নীরবেই প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

আমাদের জনমানসে একটি প্রচলিত ধারণা আছে যে, রক্তে হিমোগ্লোবিন বেশি থাকা মানেই শরীর খুব চাঙ্গা। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, এই অতিরিক্ত রক্তকণিকা আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপ। যখন রক্তে লোহিত রক্তকণিকার ঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন রক্ত ঘন ও আঠালো হয়ে পড়ে। ফলে শরীরের সরু ধমনী ও শিরা দিয়ে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়, যা হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

কখন বুঝবেন আপনি পলিসাইথেমিয়ায় আক্রান্ত?

সাধারণত একটি রুটিন রক্ত পরীক্ষা বা কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (সিবিসি) করলেই এই অবস্থা ধরা পড়ে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, লোহিত রক্তকণিকার একটি নির্দিষ্ট মাত্রা রয়েছে। যদি পুরুষদের ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ১৭.৫ গ্রাম/ডেসিলিটার এবং নারীদের ক্ষেত্রে ১৫.৫ গ্রাম/ডেসিলিটার অতিক্রম করে, তবে তাকে ‘পলিসাইথেমিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

কেন বাড়ে এই লোহিত কণিকা?

পলিসাইথেমিয়া মূলত দুই ধরনের হতে পারে— প্রাইমারি এবং সেকেন্ডারি। প্রাইমারি পলিসাইথেমিয়া সাধারণত বোন ম্যারো বা অস্থিমজ্জার সমস্যার কারণে হয়, যেখানে শরীর অনিয়ন্ত্রিতভাবে রক্তকণিকা তৈরি করতে থাকে। অন্যদিকে, সেকেন্ডারি পলিসাইথেমিয়া হতে পারে ধূমপান, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, কিংবা অনেক উঁচুতে বসবাসের কারণে অক্সিজেনের অভাব মেটাতে শরীর যখন অতিরিক্ত লোহিত কণিকা তৈরি করে। এছাড়া পানিশূন্যতাও সাময়িকভাবে রক্তকে ঘন করে তুলতে পারে।

উপসর্গের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিপদ

অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগী বুঝতেই পারেন না যে তার রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়ছে। তবে কিছু লক্ষণ দেখে সচেতন হওয়া জরুরি:

  • অকারণে মাথা ঘোরা বা তীব্র মাথাব্যথা।

  • অতিরিক্ত অবসাদ ও ঝিমুনি ভাব।

  • গোসল করার পর শরীরে অস্বাভাবিক চুলকানি।

  • দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসা বা কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ হওয়া।

  • হাত ও পায়ের তালু লাল হয়ে যাওয়া বা জ্বালাপোড়া করা।

জরুরি কিছু তথ্য ও পরিসংখ্যান

রক্তের এই জটিল অবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকতে নিচের বিষয়গুলো মনে রাখা প্রয়োজন:

  • বিপজ্জনক মাত্রা: পুরুষদের জন্য ১৭.৫ এবং নারীদের জন্য ১৫.৫ গ্রাম/ডেসিলিটারের বেশি হিমোগ্লোবিন সতর্কবার্তা।

  • রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি: রক্ত অতিরিক্ত ঘন হয়ে গেলে ফুসফুস বা মস্তিষ্কে রক্ত জমাট (Clot) বেঁধে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

  • ধূমপানের প্রভাব: চেইন স্মোকারদের শরীরে কার্বন মনোক্সাইড বেড়ে যাওয়ায় অক্সিজেনের ঘাটতি হয়, ফলে শরীর বাধ্য হয়ে বেশি হিমোগ্লোবিন তৈরি করে।

  • শনাক্তকরণ: প্রতি বছর অন্তত একবার অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে সিবিসি পরীক্ষা করা জরুরি।

সমাধান ও প্রতিকার

পলিসাইথেমিয়া ধরা পড়লে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে চিকিৎসায় অবহেলা করা চলবে না। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা ‘ফ্লেবোটোমি’ বা শরীর থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্ত বের করে দেওয়ার পরামর্শ দেন, যা রক্তদান করার মতোই একটি প্রক্রিয়া। এতে রক্তের ঘনত্ব দ্রুত কমে আসে। এছাড়া মূল কারণ (যেমন ধূমপান বা ফুসফুসের রোগ) চিহ্নিত করে তার চিকিৎসা করা হলে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

পরিশেষে, সুস্বাস্থ্য মানেই কেবল ঘাটতি পূরণ নয়, বরং ভারসাম্যের নাম। হিমোগ্লোবিন কম হলে যেমন প্রতিকার প্রয়োজন, ঠিক তেমনি বেশি হলেও বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

রিপোর্টার

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার