রক্তস্বল্পতা নয়, রক্ত বেড়ে যাওয়াই যখন বিপদের কারণ
রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া বা অ্যানিমিয়া নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটি আরও ভয়ংকর হতে পারে। রক্তে লোহিত রক্তকণিকা বা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘পলিসাইথেমিয়া’ বলা হয়, তা নিরবে ডেকে আনতে পারে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো মারাত্মক ঝুঁকি।
আমরা সাধারণত জানি যে শরীরে রক্ত কম থাকলে দুর্বলতা বা ক্লান্তি আসে। কিন্তু রক্ত যখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঘন হয়ে যায়, তখন শরীরের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা সাধারণত ১৩.৫ থেকে ১৭.৫ গ্রাম/ডেসিলিটার এবং নারীদের ক্ষেত্রে ১২.০ থেকে ১৫.৫ গ্রাম/ডেসিলিটার। যখনই এই সীমা অতিক্রম করে পুরুষদের ক্ষেত্রে ১৭.৫ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ১৫.৫ এর উপরে চলে যায়, তখনই চিকিৎসকরা একে ‘পলিসাইথেমিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
পলিসাইথেমিয়া মূলত দুই ধরনের হতে পারে। একটি হলো ‘পলিসাইথেমিয়া ভেরা’, যা একটি জেনেটিক সমস্যা বা অস্থিমজ্জার রোগ। এখানে শরীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করতে থাকে। অন্যটি হলো ‘সেকেন্ডারি পলিসাইথেমিয়া’, যা সাধারণত শরীরের অন্য কোনো সমস্যার প্রতিক্রিয়ায় ঘটে।
দীর্ঘদিন ফুসফুসের সমস্যায় ভোগা রোগী, অতিরিক্ত ধূমপায়ী, অথবা যারা অনেক উঁচুতে বসবাস করেন (যেখানে অক্সিজেনের অভাব রয়েছে), তাদের শরীর অক্সিজেনের ঘাটতি মেটাতে অতিরিক্ত রক্তকণিকা তৈরি শুরু করে। এছাড়া কিডনির টিউমার বা নির্দিষ্ট কিছু হরমোনের ওষুধের প্রভাবেও এটি হতে পারে।
রক্ত ঘন হয়ে গেলে তা সরু রক্তনালীর মধ্য দিয়ে সহজে চলাচল করতে পারে না। ফলে শরীরে কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন, অতিরিক্ত মাথাব্যথা এবং মাথা ঘোরানো, শারীরিক ক্লান্তি ও ঝিমঝিম ভাব, গোসলের পর শরীরে অস্বাভাবিক চুলকানি, দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসা, মুখমণ্ডল বা হাতের তালু অতিরিক্ত লালচে হয়ে যাওয়া।
চিকিৎসকদের মতে, এই রোগটি অনেকটা ‘টাইম বোমা’র মতো। রক্ত ঘন হয়ে জমাট বেঁধে যাওয়ার (Clotting) প্রবণতা বেড়ে যায়। এর ফলে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, প্লীহা বড় হওয়া, গাউট বা গেঁটে বাত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
পলিসাইথেমিয়া ধরা পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে বিশেষজ্ঞ হেমাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে ‘ফ্লেবোটোমি’ বা শরীর থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্ত বের করে দেওয়ার মাধ্যমে রক্তের ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ করা হয়—যা অনেকটা রক্তদানের মতোই একটি প্রক্রিয়া। এছাড়া মূল কারণ (যেমন ধূমপান বা ফুসফুসের রোগ) চিহ্নিত করে চিকিৎসা করলে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
রক্তের স্বল্পতা যেমন ক্ষতিকর, আধিক্য ঠিক ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের দেশে হিমোগ্লোবিন বেড়ে যাওয়াকে অনেকেই ‘সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ’ মনে করে ভুল করেন, যা আসলে বড় কোনো বিপদের পূর্বাভাস হতে পারে।





