মাথায় ফুটবল, সাইকেলে ২০.২ কি.মি. পাড়ি দিয়ে মাগুরার হালিমের চতুর্থ গিনেস রেকর্ড!
মাথার ওপর ফুটবল ঠিক রেখে দুই হাত হ্যান্ডেলে, একটানা ২০.২০ কিলোমিটার (১২.৫৫ মাইল) পথ সাইকেল চালিয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদ আবদুল হালিম (৪৯) গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছেন। এই অভূতপূর্ব কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি গত ২২ ফেব্রুয়ারি মাগুরা ইনডোর স্টেডিয়ামে। যাচাই-বাছাই শেষ করে গত শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) গিনেস কর্তৃপক্ষ এই রেকর্ডের স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি তাঁর চতুর্থ গিনেস রেকর্ড, যা দেশবাসীর মাঝে উল্লাসের সঞ্চার করেছে।
মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার শতখালী ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুল হালিমের জন্য মাথায় ফুটবল রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাইকেল চালানো বা অন্যান্য কসরত কোনো নতুন ব্যাপার নয়। তিনি অর্ধশতাধিক আকর্ষণীয় ফুটবল কসরত দেখাতে পারেন, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে। এই দক্ষতা অর্জনের ফলে ২০১১, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে তিনটি গিনেস রেকর্ড গড়েন তিনি। গতকাল স্বীকৃতির পর তিনি বলেন, “এই রেকর্ড দেশের সুনাম বাড়িয়েছে, কিন্তু বিনিময়ে আমি কোনো সুবিধা পাইনি।”
নিজের রেকর্ড ভেঙে নতুন মাইলফলক
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, ‘দ্য গ্রেটেস্ট ডিসট্যান্স ট্রাভেল্ড অন এ বাইসাইকেল ব্যালান্সিং এ ফুটবল অন দ্য হেড’ শিরোনামে এই রেকর্ডের মালিক এখন আবদুল হালিম। ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা ১৯ মিনিট পর্যন্ত একটানা মাগুরা ইনডোর স্টেডিয়ামে সাইকেল চালিয়ে তিনি এই দূরত্ব অতিক্রম করেন। এর মধ্যে একবারও ফুটবল মাথা থেকে পড়েনি এবং হাত দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেননি। এই অভূতপূর্ব দক্ষতা গিনেসের যাচাইকারীদের মুগ্ধ করেছে।
এই রেকর্ড গড়তে তিনি নিজের পুরনো রেকর্ডই ভেঙেছেন। ২০১৭ সালের ৮ জুন ঢাকার শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে ১ ঘণ্টা ১৯ মিনিটে মাথায় ফুটবল রেখে ১৩.৭৪ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে তিনি গিনেসে নাম লিখিয়েছিলেন। সেই রেকর্ড সাত বছরেরও বেশি সময় তাঁর দখলে ছিল। গিনেসে প্রথম নাম ওঠে ২০১১ সালের ২২ অক্টোবর—ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে মাথায় বল রেখে ১৫.২ কিলোমিটার হেঁটে। সেই রেকর্ড এখন অন্যের হাতে চলে গেছে।
দ্বিতীয় রেকর্ড আসে ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর। ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনের ২ ও ৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে মাথায় বল রেখে রোলার স্কেটিং করে ১০০ মিটার দূরত্ব ২৭.৬৬ সেকেন্ডে অতিক্রম করে তিনি ‘ফাস্টেস্ট ১০০ মিটার অন রোলার স্কেটস উইথ এ ফুটবল ব্যালান্সড অন দ্য হেড’ রেকর্ড গড়েন। এই রেকর্ড এখনও তাঁর নামে রয়েছে।
কসরতের যাত্রা: ছোটবেলার নেশা থেকে পেশা
আবদুল হালিমের ফুটবল কসরতের যাত্রা শুরু হয় ৯০-এর দশকের শুরুতে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা তিনি ছোটবেলায় এক গোলকিপারের বল নিয়ন্ত্রণ দেখে এতে আগ্রহী হন। গত ৩৩ বছর ধরে তিনি ফুটবল নিয়ে নানা কৌশল শিখেছেন এবং প্রদর্শন করেছেন। এখনও নিয়মিত চর্চা করেন। তিনি বলেন, “এটাই আমার পেশা। অন্য কোনো কাজ শেখার সময় হয়নি।”
বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কসরত দেখিয়ে যে সম্মানীয় অর্থ পান, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চালান। আগের তিন রেকর্ডে স্পনসর ছিল, কিন্তু এবার কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই রেকর্ড গড়েছেন।
নতুন রেকর্ডের স্বীকৃতির পর তিনি প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “একটা রেকর্ড করতে অনেক সময়, শ্রম ও অর্থ লাগে। পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া আমার মতো সাধারণ মানুষ কীভাবে করবে? যদি আমি না খেয়ে থাকি, তাহলে অন্যরা কীভাবে আগ্রহী হবে?”
তিনি চান, এই কৌশলগুলো নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। “স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা শিখুক, নতুন রেকর্ড গড়ুক। কিন্তু এর জন্য সরকারি-বেসরকারি সাহায্য দরকার। আমারও আরও রেকর্ড গড়ার ইচ্ছা আছে, কিন্তু অর্থসংকটে সব আটকে যাচ্ছে।”
মাগুরা জেলা ক্রীড়া সংস্থার আহ্বায়ক (জেলা প্রশাসক) মো. অহিদুল ইসলাম বলেন, “আবদুল হালিমের অর্জনে আমরা গর্বিত। তিনি আরও কৃতিত্ব গড়ুক, জেলা প্রশাসন ও ক্রীড়া সংস্থা পাশে আছে। বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে তার কসরত প্রদর্শন করানো হয়। বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তিনি আরও উন্নতি করতে পারবেন।”
আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ও আবদুল হালিমের এই দক্ষতা ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের ক্রীড়া জগতের জন্য একটি ইতিবাচক উদাহরণ।





