অর্থ-বাণিজ্য ফিচার

ভোলার গ্যাস পৌঁছাবে জাতীয় গ্রিডে, এগোচ্ছে দীর্ঘতম সেতুর পরিকল্পনা

১০ অক্টোবর তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর উদ্বোধন

দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে প্রস্তাবিত ভোলা-বরিশাল সেতু। প্রায় ১০ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতু নির্মিত হলে এটি হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সেতু। শুধু ভোলা ও বরিশালের মধ্যে স্থায়ী সড়ক যোগাযোগই নয়, জাতীয় অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৩ সালের মধ্যে সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপানের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মিয়াগাওয়া কেনসেটসু কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।

সম্প্রতি রাজধানীতে অনুষ্ঠিত অষ্টম বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের সভায় ভোলা-বরিশাল সেতুকে নতুন অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু প্রকল্পও এই তালিকায় স্থান পায়। সভায় জাপানি প্রতিষ্ঠানটি দুটি প্রকল্পেই আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণের আগ্রহ জানায়।

সেতু বিভাগ ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ভোলা-বরিশাল সেতুর জন্য ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। পিপিপি নীতিমালা অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণের সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করবে বাংলাদেশ সরকার।

২০২৪ সালে সম্পন্ন হওয়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বলছে, সেতুটি চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পাশাপাশি কর্মসংস্থানেরও বিস্তৃত সুযোগ সৃষ্টি হবে। দীর্ঘমেয়াদে আগামী ৩০ বছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ অবদান রাখতে পারে এই প্রকল্প।

তবে সেতুটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে জ্বালানি খাতকে। বর্তমানে ভোলার প্রাকৃতিক গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহে যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেতু নির্মাণের মাধ্যমে তা অনেকটাই দূর হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এর ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে এবং গ্যাসনির্ভর শিল্প সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মিয়াগাওয়া কেনসেটসু এককভাবে কিংবা অন্য কোনো জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে পারে। তবে চূড়ান্ত নির্বাচন হওয়ার আগে ট্রানজিশন পরামর্শক নিয়োগ, বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই এবং রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) আহ্বানের মতো কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করা হবে। মূল্যায়নের পর নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করবে সরকার।

বাংলাদেশে মিয়াগাওয়ার স্থানীয় অংশীদার হিসেবে কাজ করছে স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদের ভাষ্য, ভোলা-বরিশাল সেতু শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণেও এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অন্যদিকে, শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু প্রকল্পের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৮ কিলোমিটার এবং সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। সেতুটি নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১১ জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে খুলনা ও চট্টগ্রামের মধ্যকার সড়কপথ প্রায় ৯০ কিলোমিটার কমে আসবে এবং রাজধানী ঢাকার ওপর যানবাহনের চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

একই বৈঠকে ভোলা-লক্ষ্মীপুর সেতু প্রকল্পও উপস্থাপন করা হয়। মেঘনা নদীর ওপর প্রস্তাবিত এই সেতুর প্রতিও আগ্রহ দেখিয়েছে জাপানি প্রতিনিধি দল। সেতু বিভাগের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও গতিশীল হবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে আন্তর্জাতিক মানের বিনিয়োগ আকর্ষণের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সভায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর প্রতি সরকারের পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও জাপান একসঙ্গে কাজ করে যাবে।

 

 

প্রতিবেদক

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

জাতীয় ফিচার

নারায়ণগঞ্জে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’-এ বিএনপি নেতারা : তৈমুর

‘তৈমুর সাহেব ঘুঘু দেখেছেন, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেননি। টের পাবেন আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে, যে আশায় রয়েছেন, সেই আশায় গুঁড়েবালি।’ জাহাঙ্গীর
ফিচার ব্যবসা-বাণিজ্য

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে

আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ কার্যদিবসে আইসিই ফিউচারস এক্সচেঞ্জে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার