প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ
সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও জনসেবা নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসনের ভেতরে শৃঙ্খলা জোরদারে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, ঊর্ধ্বতন নির্দেশ অমান্য কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জনপ্রশাসন ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর না হলে জনসেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন।
এ লক্ষ্যে দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কাছে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি কাজে শৈথিল্য, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা সেবাদানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সরকারি সিদ্ধান্ত ও সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগেই কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। কেউ কেউ সমাবেশ, মানববন্ধন, কর্মবিরতি বা অবস্থান কর্মসূচির মতো কার্যক্রমেও অংশ নিচ্ছেন, যা বিদ্যমান আচরণবিধি ও চাকরিসংক্রান্ত আইনবিরোধী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে, বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করতে বা অন্যদের উসকানি দিতে পারবেন না। একইভাবে কোনো ধরনের অসন্তোষ প্রকাশ করে আন্দোলন বা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের বিষয়েও বিধিনিষেধ রয়েছে।
সরকারি প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সচিবালয় ও মাঠ প্রশাসনের কিছু ক্ষেত্রে কর্মসূচির নামে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করা এবং সহকর্মীদের কাজে বিঘ্ন ঘটানোর মতো ঘটনা ঘটছে। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জনসেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ যাতে কোনো ধরনের দুর্ভোগে না পড়েন, সে বিষয়টি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তাই জনসেবা ব্যাহত করে এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
জানা গেছে, সরকারি চাকরি-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশোধিত বিধান অনুযায়ী বেআইনি কর্মবিরতি, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য করাকে সরাসরি ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। এসব অপরাধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, সাময়িক বরখাস্ত বা বাধ্যতামূলক অবসরের মতো শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জনগণের কল্যাণে নেওয়া সরকারি সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। এ কারণে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি ও কর্মদক্ষতা নিশ্চিত করা হবে।
প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করে সরকারি কর্মচারীদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের ওপর। জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে সুশাসন ও কঠোর জবাবদিহির কোনো বিকল্প নেই।





